হাবিবুল বাশার
দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জুলাই আন্দোলনে আহতদের জন্য দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নিÑ এমন অভিযোগ তুলছেন ভুক্তভোগীরা। অন্য দিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি সরকার জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হাতে নেয়ার কথা জানিয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল-২০২৬’। এই আইনটির ল্য ছিল আন্দোলনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও সামাজিক সুরা নিশ্চিত করা; কিন্তু বাস্তব চিত্র নিয়ে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের বক্তব্য ভিন্ন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রাক্কলন ও প্রপেণ অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট খাতে দীর্ঘমেয়াদি বরাদ্দের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারের সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসা বাবদ সহায়তা অনুদান ব্যয়ে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ল করা গেছে। সূত্র জানায়, শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসা ও সহায়তা খাতে বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। এই খাতে আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বরাদ্দ কমিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, চিকিৎসা ও প্রাথমিক সহায়তা খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩৮% কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে আগামী ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এই খাতে কোনো বরাদ্দ থাকবে না। অন্য দিকে শহীদ পরিবার ও আহতদের সম্মানী ভাতা ২০২৫-২৬ বরাদ্দ ছিল ২১২ কোটি এক লাখ টাকা। ওই খাতে আগামী ২০২৬-২৭, ২০২৭-২৮, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, অর্থাৎ অর্থবছরগুলোতে ২১২ কোটি এক লাখ টাকাই বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত জুলাইযোদ্ধাদের দেখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যাংককের ভেজথানি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাইযোদ্ধাদের সার্বিক খোঁজখবর রাখছে এবং তাদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য সব ব্যয় বহন করছে। এ ছাড়া রাশিয়া, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কে চিকিৎসাধীন জুলাইযোদ্ধাদেরও সার্বিক তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে। তাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয়ও সরকার বহন করছে।
মন্ত্রী জানান, বর্তমানে এমআইএস-ভুক্ত জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৬৯ জন এবং শহীদের সংখ্যা ৮৪৪ জন। এ অধিদফতর প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই, তালিকা প্রণয়ন, সংশোধন ও গেজেট প্রকাশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে কাজ করছে। আন্দোলনের আদর্শ ও ল্য সংরণ, ইতিহাস ও স্মৃতি রা এবং জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদফতর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য আহত ১৫২ জন জুলাইযোদ্ধাকে রাশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৯২ জন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন এবং বর্তমানে ৬০ জন বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে সরেজমিন এসব ঘোষণার সাথে বাস্তবতার অমিল চোখে পড়ে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শহীদের বাবা ােভ জানিয়ে বলেন, ‘আজ আমরা অত্যন্ত অসহায়। সরকারি কোনো কাজে গেলে শুনতে হয়Ñ এরা তো টাকা পেয়েছে, আবার কেন এসেছে?’ এমন আচরণে মনে হয়, ‘আমাদের সন্তানদের আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়া কি ভুল ছিল? শহীদ পরিবারের মর্যাদা কি আমরা আদৌ পাচ্ছি?’
একই ধরনের হতাশার কথা জানান ২০ বছর বয়সী আহত যোদ্ধা ফজলুল করিম। তিনি বলেন, ‘১৮ জুলাই ২০২৪ যাত্রাবাড়ীতে ছররা গুলিতে আমি গুরুতর আহত হই। দেড় বছর পার হলেও পরিবারের জন্য কোনো কর্মসংস্থান বা আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি।
পুনর্বাসনের যে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, তা বাস্তব রূপ পায়নি। সরকারি সহায়তা পেতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা পেলেও তা তুলতে গিয়ে ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। ছোটখাটো অনুদানও অনেকসময় পাইনি। বর্তমানে ঋণের চাপে পড়ে নিজের রিকশা বিক্রি করে দিতে হয়েছে।’
১৯ বছর বয়সী আহত ইয়াহইয়া আল হুনাইদি জানান, পুলিশের আঘাতে তার হাত ভেঙে যায়। ‘সরকারি অনুদান হিসেবে তিন লাখ টাকা ও ভাতা পাচ্ছি; কিন্তু স্থায়ী পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। হাতে আবার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, কিন্তু উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছি না। স্বাস্থ্য কার্ড থাকলেও হাসপাতালে সেবা পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়,’ Ñবলেন তিনি।
আরেক যোদ্ধা মুজাহিদের অভিযোগ, ‘দেশ যেন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। বাকস্বাধীনতা সঙ্কুচিত হচ্ছে। আমার সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার শিকার হচ্ছে।’
আইনি কাঠামো ও বড় বাজেটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক েেত্র হতাশাজনক। সাভারের আশুলিয়ায় গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারানো রিকশাচালক মিজান কিংবা যাত্রাবাড়ীতে আহত ফজলুল করিমের মতো বহু যোদ্ধা এখনো আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক পরিবার এখনো প্রতিশ্রুত সহায়তা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর দাবিÑ তারা শুধু এককালীন অনুদান নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা চান।
জুলাই আন্দোলনের এই যোদ্ধাদের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



