হুমায়ূন আহমেদ তার মৃত্যু ও স্মৃতি

Printed Edition

আবদুল হাই শিকদার

হুমায়ূন আহমেদ ভারতীয় বাংলা সাহিত্যকে পরাজিত করেছিলেন। গতিরোধ করেছিলেন ভারতীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের। নির্মাণ করেছিলেন খাঁটি বাংলাদেশী সাহিত্য। জীবন যন্ত্রণায় দগ্ধ মধ্যবিত্তকে তিনি বিলিয়ে গেছেন সৌন্দর্য ও আনন্দমাখা রূপকথা।

বাংলাদেশের পাঠক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, তিনি ঘরে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাদের মধ্যে বুনে দিয়েছেন স্বপ্ন। লজিক ও এন্টি-লজিকের পৃথিবী। শুভ্রের অনাবিল আবহ। তিনি এই পোড়া দেশের তরুণ-তরুণীদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন মডেল।

বাংলাদেশের নিভু নিভু প্রকাশনা শিল্পকে তিনি দিয়েছেন প্রাণ, দিয়েছেন প্রতিষ্ঠা। কলকাতার কৃত্রিম ভাষা ও ভঙ্গির বিরুদ্ধে খাড়া করেন খাঁটি বাংলাদেশী ভাষাকে। সব ধরনের নেগেটিভ বিষয়-আশয় পরিহার করে তিনি উচ্চকিত করেন বাংলাদেশের আত্মাকে, তার আত্মার ভাষাকে। লোকসংস্কৃতি ও মরমি গানকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। ঐতিহ্যের করেছেন নবায়ন। জীবন থেকে দূর করেছিলেন হীনম্মন্যতা, ফিরিয়ে এনেছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস।

এই ভারত ও ভারতীয় বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ বলে গেছেন, ‘...ভারতের প্রতি আমার কোনো মমতা নেই। কারণ ভারত আমাদের দীর্ঘ সময় শোষণ করেছে। এখনো করছে। আমাদের সাহিত্যকেও ঠিকমত মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়নি। কাজেই এদের প্রতি কোনো মোহ থাকার কারণ নেই। ...তবে তাদের দিন শেষ। বর্তমান ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের। বাংলা সাহিত্যে ভবিষ্যতে কোনো মহৎ সৃষ্টি এদেশের লেখকদের দ্বারাই কেবল সম্ভব এবং তারা সেই দায়িত্ব পালন করবেন বলে আমার বিশ্বাস। বাংলা ভাষাকে এদেশের লেখকরাই এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হওয়ার মতো উপকরণ এ দেশে আছে। ওয়ার অ্যান্ড পিস লেখা হয়েছে নেপোলিয়ন যখন রাশিয়া আক্রমণ করলেন তারপর। এ দেশের মানুষ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। মুখের ভাষা ফিরিয়ে এনেছে। স্বৈরাচার হটিয়েছে। কাজেই মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হবে এদেশে, না কি কলকাতায়? যেখানে হিন্দু আগ্রাসনের কাছে সমস্ত মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেয়া হয়েছে?’ (ঘরে বাইরে হুমায়ূন আহমেদ : হাজার প্রশ্ন, মাহফুজ আহমদ, পৃষ্ঠা-৬৬)।

সেই হুমায়ূন ছিলেন বিজয়ী নায়ক। কিন্তু আমরা আমাদের নায়ককে সামনে নিয়েও ভারতীয় বাংলা ভাষার কাছে পরাজিত হলাম। হুমায়ূনের কোনো বইয়ে ‘মরদেহ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশী শব্দ ‘লাশ’। কিন্তু ভারতীয় বাংলা শব্দ মরদেহের কাছে বাংলাদেশী বাংলা শব্দ লাশ হেরে গেল আমাদের সচেতনাহীন সংবাদপত্র ও বিভিন্ন চ্যানেলের বদৌলতে। তারা ৭ দিন ধরে হুমায়ূনের লাশকে মরদেহ বানিয়ে কবরস্থ করল নুহাশ পল্লীতে।

লাশ ও মরদেহ দুটোই নিষ্পাপ শব্দ। বাংলা অভিধানে দুটোর অর্থই এক। দুটোই বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত। তারপরও পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য কোনো সাম্প্রদায়িক পার্থক্য নয়। হিন্দু-মুসলমানের কোনো সমস্যাও নয়। এই পার্থক্য সম্পূর্ণরূপে সাংস্কৃতিক পার্থক্য। ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে যে পার্থক্য, বীরভূম এবং বরিশালের মধ্যে যে পার্থক্য, দুলাভাই ও জামাইবাবুর মধ্যে যে পার্থক্য, মাসি ও খালার মধ্যে যে পার্থক্য, উৎপল দত্ত ও খলিলের মধ্যে যে পার্থক্য, নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে হর্ষ দত্তের যে পার্থক্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়ার যে পার্থক্য, অজয় নদীর সঙ্গে বুড়িগঙ্গার যে পার্থক্য- এ হলো সেই পার্থক্য। এই পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা হুমায়ূনের ছিল। তাই তিনি বড় হতে পেরেছিলেন। অন্যদের এই বোধশক্তি নেই। তাই তারা ‘বনসাই’ হয়েই জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন।

হুমায়ূন আহমেদ বারবার বলেছেন, দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আমাকে নিয়ে কী ভাবছেন তা জানার কোনো প্রয়োজন মনে করি না। আমি জানতে চাই একজন সাধারণ মানুষ, যে আমার বই পড়েছে, নাটক দেখছে- সে আমাকে নিয়ে কী ভাবছে। ওদের ভাবনা আমি জানি। আর জানি বলেই বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ভাবনাচিন্তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।

বিশেষ করে দলবাজ বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক লাঠিয়ালদের তিনি শতহস্ত দূর থেকেই বিদায় করে দিয়েছেন সবসময়। এদের মূর্খতা, ভণ্ডামি ও স্বার্থপরতার ব্যাপারে তিনি পুরো মাত্রায় সচেতন ছিলেন।

অবাক হওয়ার মতো বিষয়, সেই সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাডাররাই দখল করে নিয়েছিল তার লাশ। নিজেদের বীরত্ব, মমত্ব ও দায়িত্ববোধ দেখানোর এত বড় সুযোগ কীভাবে হাতছাড়া করে তারা। তো সরকারের পূর্ণ সাহায্য নিয়ে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাডাররা শকুনের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের হুলুস্থুল কাণ্ডকারখানা ও মুষলধারে কান্নাকাটি দেখে দেশের মানুষের আক্কেলগুড়–ম হয়ে গেছে। হয়ে পড়েছিল বাক্যহারা, স¤ি¦তহারা। দেশের মানুষের অবস্থা যাই হোক, আমার ধারণা- হুমায়ূনের ‘কীর্তিমান’ ভাই ড. জাফর ইকবালও হয়তো বোধ করেছেন অস্বস্তি।

তো ক্যাডারদের মোটেই অজানা নয়, হুমায়ূন তাদের সম্পর্কে বরাবর কী মনোভাব পোষণ করেছেন। তাদের নেতানেত্রী সম্পর্কেই বা কী বলে গেছেন। তার পরও তারা হুমায়ূনের লাশ আঁকড়ে ধরে দল ও ব্যক্তিস্বার্থ আদায় করতে চেয়েছেন।

নিজের নয়, হুমায়ূন আহমেদের কথা থেকেই উদ্ধৃত দিচ্ছি- ‘মহাত্মা গান্ধী মৃত্যুর আগে বলে গেছেন, ভগবান তুমি ভারতকে দেখো। পাকিস্তানের লিয়াকত আলী খান মৃত্যুর আগে শেষ কথা বলেছেন, আল্লাহ পাকিস্তানকে হেফাজত করো। পৃথিবীর বিখ্যাত নেতারা মৃত্যুর আগে শেষ কথাটি বলে গেছেন দেশ ও দেশের মানুষ সম্পর্কে। দেশের কল্যাণ কামনা করেই তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমাদের এক নেতা গুলি খাওয়ার পর দেহরক্ষীর নাম ধরে বললেন, ‘আমাকে শেষ করে ফেলেছে, আমাকে বাঁচা।’ মৃত্যুর সময় তার কাছে দেশ নয়, দেশের মানুষ নয়, তিনিই বড় হয়ে রইলেন।

আমাদের দেশে সেই নেতা প্রয়োজন যিনি মৃত্যুর সময় নিজের কথা ভাববেন না। দেশের মানুষের কথা ভাববেন। এরকম নেতা তৈরি করতে হবে। এ দেশের মানুষ এক দিন সেই নেতা তৈরি করবেই। এটা আমার বিশ্বাস।’ (ঘরে বাইরে হুমায়ূন আহমেদ : হাজার প্রশ্ন, মাহফুজ আহমেদ, পৃষ্ঠা-৬৬)।

আমাদের তিন জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তার বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য ‘মওলানা ভাসানী অসাধারণ নেতা। স্বপ্নদ্রষ্টা। শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা। জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ স্বপ্নে’র রূপকার। স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক তিনিই দিয়েছিলেন। বেতারে তার ঘোষণায় রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।’ (ঘরে বাইরে হুমায়ূন আহমেদ: হাজার প্রশ্ন, মাহফুজ আহমেদ, পৃষ্ঠা-৩০)।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বেগম জিয়া ছিলেন হুমায়ূনের একজন গুণগ্রাহী। হুমায়ূন আহমেদ এটা জানতেন। এ বিষয়ের ওপর কয়েকটি তথ্য দিতে চাই। দিতে চাই এই কারণে যে, হুমায়ূনকে আওয়ামী লীগের নৌকায় তোলার জন্য মরিয়া তৎপরতা চলছে। সরকারের সাংস্কৃতিক লাঠিয়ালরা এজন্য আগ বাড়িয়ে দখল করে নিতে চাচ্ছে সব। মুছে দিতে চাইছে অন্য সব পরিচিতি। যা খুবই দৃষ্টিকটূ হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।

শুরুটা করতে চেয়েছিলাম আমার সাথে হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু আপাতত সে প্রসঙ্গ থাক। অন্য একদিন এ বিষয় নিয়ে লেখা যাবে। তবে যেটুকু বিষয় যুক্ত কেবল সেটুকুই বলছি।

আমি তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘কথামালা’ নামে একটি সাহিত্য-সংস্কৃতিনির্ভর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করি। ৫০ মিনিটের প্রোগ্রাম। মাসে একবার প্রচার হয়। বলে রাখা ভালো, তখন বিটিভিই দেশের একমাত্র চ্যানেল।

কবি কথাশিল্পী আহমদ ছফা একদিন রাগ করলেন আমার ওপর। কী করে বেড়াচ্ছেন? ইতিহাসে নাম লেখানোর জন্য কিছু করুন। দেশের স্বার্থে হুমায়ূনকে নিয়ে এগিয়ে যান। আমি প্রস্তাবটা লুফে নিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো বিটিভিকে নিয়ে। জীবন্ত একজনের ওপর এককভাবে পঞ্চাশ মিনিটের একটা ডকুমেন্টারি প্রোগ্রাম করার যৌক্তিকতা নিয়ে তারা চিন্তায় পড়লেন। আমি গেলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মরহুম মোজাম্মেল হক তখন প্রেস সচিব। তাকে বললাম। তিনি নিজেও হুমায়ূনের মুগ্ধ পাঠক ছিলেন। আমাকে নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সব শুনে বললেন, হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন অসাধারণ গুণী লেখকের জন্য ৫০ মিনিটের একটা ম্যাগাজিন করা আর এমন বেশি কী? করুন।

আমি ছুটলাম হুমায়ূন ভাইয়ের কাছে। কবি আতাহার খান আর আমি হাজির হলাম। হুমায়ূন ভাই সানন্দে সম্মতি দিলেন। নানা দৌড়ঝাঁপ করে ২০ দিনের মধ্যে শেষ করলাম ডকুমেন্টারির কাজ। প্রচার হলো যথারীতি ‘কথামালা : হুমায়ূন পর্ব’, হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে নির্মিত ও প্রচারিত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন। সময়টা ১৯৯৩ সাল, ৯ই মার্চ।

৫৫ মিনিটের ওপর ছিল প্রোগ্রামটা। আজকের বিটিভির প্রধান নির্বাহী আমাদের প্রিয় শিল্পী রওশন আরা মুস্তাফিজের স্বামী এবং হুমায়ূনের শঙ্খনীল কারাগারের চলচ্চিত্রকার মুস্তাফিজুর রহমান তখন সম্ভবত অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান। তিনি আমার প্রযোজক আলাউদ্দিন আহমদকে বলে দিয়েছিলেন, ভালো প্রোগ্রাম হয়েছে। অতিরিক্ত সময় কোনো সমস্যা নয়।

অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল রাত ১১টায়। মোজাম্মেল ভাইয়ের ফোন, শিকদার, প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানটা দেখেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে বলেছেন।

তত দিনে মোজাম্মেল ভাইয়ের সাথেও হুমায়ূন ভাইয়ের একটা ভালো সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। দু’জনই আমুদে মানুষ। মিল হয়ে গেল দ্রুত। মোজাম্মেল ভাই ও সে সময়কার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সৈয়দ আবদাল আহমদের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হুমায়ূনের এক-দুবার সাক্ষাৎও হয়ে গেল।

হুমায়ূন আহমেদ তখন ‘আগুনের পরশমণি’ নির্মাণ নিয়ে মেতে উঠেছেন। সরকারি অনুদানের জন্য আবেদন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছবি। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টা জেনে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে বলে দিলেন, যদি একটা ছবিকেও অনুদান দিতে হয় তাহলেও সেটা যেন হুমায়ূন আহমেদের ছবিকে দেয়া হয়। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সানন্দে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করলেন।

সরকারি অনুদানের পরিমাণ সে সময় ছিল মাত্র ১৮ লাখ বা ২৪ লাখ টাকা। আমার ঠিক মনে নেই। হুমায়ূন ছবি নিয়ে মাঠে নেমে গেলেন। দরকার সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সাহায্য। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ছবি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য, ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান ইত্যাদি না হলে চলবে কেন? সে ব্যবস্থা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার মিলিটারি সেক্রেটারি আজকের আওয়ামী লীগের এমপি মেজর জেনারেল (অব:) সুবিদ আলী ভূঁইয়া করে দিলেন।

ছবি রিলিজ করা যাচ্ছে না। এফডিসিতে বকেয়া পড়ে গেছে ২০ লাখের ওপর টাকা। আবারও এগিয়ে এলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বললেন, ছবি বানাচ্ছেন হুমায়ূনের মতো নন্দিত কথাশিল্পী। ছবিটার উপজীব্য মুক্তিযুদ্ধ। এ ছবি তো পুরোটাই রাষ্ট্রের টাকায় হওয়ার কথা। এফডিসির পুরো পাওনা মওকুফ হয়ে গেল।

রিলিজের আগেই ছবি নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেল সর্বত্র। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহ দেখালেন। হুমায়ূনও চাইলেন ছবিটা প্রধানমন্ত্রীকে দেখাবেন। তড়িঘড়ি ব্যবস্থা হলো। দ্রুত ডিএফপির ছোট প্রেক্ষাগৃহটির মেশিনপত্র, প্রজেক্টর, স্ক্রিন ঝাড়-পোছ হলো। বেগম খালেদা জিয়া হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে ছবিটা দেখলেন। ছবির শেষে দেখি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চোখ মুছছেন।

এর মধ্যে তিতুমীর কলেজের ছাত্রদল নেতারা আবদার করল, নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীরা হুমায়ূন আহমেদকে চায়। বললাম হুমায়ূন ভাইকে। বললেন, ভিড় সামলাতে পারবেন তো? বললাম পারব। পরিশেষে হুমায়ূন ভাইকে নিয়ে গেলাম তিতুমীর কলেজে। সে এক দক্ষ যজ্ঞকাণ্ড। ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক সবাই তার পাশে দাঁড়ানোর জন্য পাগল। মানুষ এত জনপ্রিয় হয়!

সে বছর আগুনের পরশমণি ৮টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেল। আমার আনন্দ ধরে না। সহায় হলেন তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম ও মরহুম মোজাম্মেল হক। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আনন্দের সাথে হুমায়ূন আহমেদের গলায় পরিয়ে দিলেন ‘একুশে পদক’। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান।

‘দেয়াল’ কী ষড়যন্ত্র

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষীদের মধ্যে চলছে তোলপাড়। সন্দেহ-সংশয়ের মেঘ ঘনিয়ে উঠছে আকাশে। গুনগুন, ফিসফাস, ক্ষোভ আর অসন্তোষে ব্যথিত বাতাস হয়ে পড়ছে গুমোট। হাজার হাজার প্রশ্ন চারদিকে। নানা অসঙ্গতির কারণে সেই সন্দেহ এখন ঘনীভূত হচ্ছে অতি দ্রুত। সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড বিশেষ করে তাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বরকন্দাজদের আচরণ এই সন্দেহকে আরো প্রকট করেছে। সন্দেহের তীর থেকে সদ্য স্বামীহারা স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম কিংবা নিউ ইয়র্কের মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা কেউই বাদ পড়ছেন না।

সন্দেহ, ষড়যন্ত্র ও সংশয়- এগুলো এখন আমাদের জাতীয় অসুখে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, কেউ একজন চাইলেই এসব বিষয়কে নাকচ করে দিতে পারছেন না। কারণ ক্ষেত্রবিশেষে দেখা গেছে, যা রটে তার কিছুটা সত্যও বটে। এই গুজবের গায়ে জোর হাওয়া লাগিয়ে দিয়েছে পত্র-পত্রিকার কিছু প্রতিবেদন। কোনো কোনো পত্রিকা তো লিখেই ফেলেছে, হুমায়ূনকে হত্যা করা হয়েছে।

আবার অনেকে এর মধ্যে আরো একটি দিক নিয়ে কথাবার্তা বলা শুরু করেছেন। সেই দিকটার নাম ‘দেয়াল’। দেয়াল হুমায়ূনের শেষ উপন্যাস। সেজন্য তারা এ উপন্যাসকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠছে তাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘দেয়াল ষড়যন্ত্র’ নামে।

সামান্য কোনো তদন্তও কোথাও হয়নি। তদন্ত করার কথা কেউ বলেনি। হুমায়ূনের কোনো পোস্টমর্টেমও হয়নি। বেলভ্যু হাসপাতালের ডিসচার্জ বা ডেথ সার্টিফিকেটও আমরা দেখিনি। তাই কী ঘটেছিল তা নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। সে সময়ও এখনো আসেনি।

ডা. মিলারের মতে, শ্বাস-প্রশ্বাসে জটিলতা, হৃদযন্ত্রের বৈকল্য এবং কিডনির ক্রমব্যর্থতাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। ক্যান্সারে তিনি মরেননি। তার রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ইনফেকশন হাসপাতাল থেকে হয়নি। হয়েছে বাসায়। খাদ্যের ভেতর দিয়ে। কোন খাদ্যে এই ইনফেকশনের জীবাণু ছিল তা তো তদন্ত ছাড়া বলা মুশকিল।

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূনের স্থান চিরকালের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। তিনি যুগস্রষ্টা। তিনি অমর। দেহগতভাবে তিনি হয়তো কবরে ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু আন্তরিকভাবে, আধ্যাত্মিকভাবে তিনি চিরকাল আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে অক্ষয় আসনে সমাসীন থাকবেন।