জাফর আহমাদ
মৃত্যুর পর প্রথম স্টেশন হলো কবর। কবর জীবনে প্রবেশের সাথে সাথে তিনটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে, সামনের স্টেশনগুলো সুগম হবে না-কি দুর্গম। অর্থাৎ এখানেই ফয়সালা হয়ে যাবে আখিরাতের বাকি স্টেশনগুলো পারাপারের সফলতা আর বিফলতা। হজরত ওসমান রা:-এর মুক্তদাস হানী বলেন, উসমান রা: কোনো কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এত কাঁদতেন যে, তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তাকে প্রশ্ন করা হলো, জান্নাত জাহান্নামের আলোচনা করা হলে তো আপনি কাঁদেন না, অথচ এই কবর দর্শনে এত বেশি কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন : আখিরাতের মানজিলসমূহের মধ্যে কবর হলো প্রথম। এখান হতে কেউ মুক্তি পেয়ে গেলে তার জন্য পরবর্তী মানজিলগুলোতে মুক্তি পাওয়া খুব সহজ হয়ে যাবে। আর এখান হতে মুক্তি না পেলে তবে পরবর্তী মানজিলগুলো আরো বেশি কঠিন হবে। তিনি (উসমান) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, আমি কবরের দৃশ্যের চাইতে অধিক ভয়ঙ্কর দৃশ্য আর কখনো দেখিনি। আবু ঈসা বলেন, হাদিসটি হাসান গরিব (তিরমিজি : ২৩০৮)।
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয় তখন দু’জন কৃষ্ণবর্ণের ও নীল চক্ষুবিশিষ্ট ফিরিশতা তার কাছে আসবেন, একজনকে বলা হয় ‘আল মুনকার’ আর অপরজনকে বলা হয় ‘আন নাকির’। তারা বলবেন, এই ব্যক্তি (নবী সা:) সম্পর্কে তুমি কি বলতে? সে তখন তাঁকে যা বলত, তা-ই বলবে যে, ইনি হলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তারপর তারা বলবেন, আমরা জানতাম যে তুমি এই কথা বলবে। এরপর তার কবর সত্তর গজ প্রশস্ত করে দেয়া হবে এবং তার জন্য এটি আলোকিত করে দেয়া হবে। এরপর তাকে বলা হবে, তুমি ঘুমিয়ে যাও। ওই ব্যক্তি বলবে, আমি আমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যেতে চাই, যাতে এই খবরটি তাদের দিতে পারি। তখন ফিরিশতা দু’জন বলবেন, নয়া দুলহার মতো তুমি ঘুমিয়ে থাক। যাকে তার পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি ছাড়া জাগায় না। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাকে তার এই শয্যা থেকে উত্থিত করবেন। আর মৃত ব্যক্তি যদি মুনাফিক হয় তবে সে বলবে, আমি তো জানি না, তবে লোকদের যা বলতে শুনেছি আমিও তাই বলেছি। ফিরিশতারা বলবেন, আমরা জানতাম তুমি এ ধরনের কথাই বলবে। এরপর জমিনকে বলা হবে একে চাপ দাও। তখন জমিন তাকে চাপ দেবে। ফলে তার পিঞ্জরের অস্থিসমূহ একটির ভেতর অন্যটি ঢুকে পড়বে। এভাবে সে আজাব ভোগ করতে থাকবে, অবশেষে তাকে আল্লাহ তায়ালা তার এ শয্যা থেকে উত্থিত করবেন (তিরমিজি : ১০৭১, মিশকাত : ১৩০)।
কবরের প্রশ্ন তিনটি নি¤œরূপ : ১. তোমার রব কে? ২. তোমার দ্বীন কী? ৩. এই ব্যক্তি কে? প্রশ্ন তিনটি অত্যন্ত সহজই মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর উত্তরগুলো সবার জন্য সহজ হবে না। আপনি যদি সারা জীবন এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে থাকেন, তথাপি তার উত্তর আপনি দিতে পারবেন না। সত্যিকারার্থে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে আপনাকে রব, দ্বীন ও মুহাম্মদ সা: এই তিনটি পরিভাষার তাৎপর্য জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী নিজের কর্মপন্থা ও কর্মনীতি ঠিক করে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত ও রাসূলুল্লাহ সা: এর প্রদর্শিত পন্থায় দ্বীনকে নিজের জন্য খালিছভাবে গ্রহণ করতে হবে।
প্রথম প্রশ্ন : তোমার রব কে? রব হলো সামগ্রিকভাবে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। আল্লাহ তায়ালাকে রব হিসাবে মানতে হবে। আল কুরআনের চারটি পরিভাষা তথা রবুবিয়াত, উলুহিয়াত, উবুদিয়াত ও দীনিয়াত। এই চারটির মধ্যে রুবুবিয়াত পরিভাষাটি ঈমানের মৌলিকত্বকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। এটি আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে বিশালাকারে প্রকাশ করে। এ শব্দটি আরবি ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহার করা হয়।
এক. মালিক ও প্রভু। দুই. অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সংরক্ষণকারী। তিন. সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, শাসনকর্তা পরিচালক ও সংগঠক। সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াতে এ শব্দটি উপস্থাপনার ভঙ্গিমায় আমরা উল্লিখিত তিনটি অর্থই মেনে নিতে পারি। আয়াতটির অর্থ হচ্ছে : ‘প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি নিখিল বিশ্ব জাহানের রব।’ প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানের মালিক। প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানসহ সব সৃষ্টির অভিভাবক, প্রতিপালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সংরক্ষণকারী। প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য, কারণ তিনিই বিশ্ব-জাহানের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, শাসনকর্তা পরিচালক ও সংগঠক।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব, যিনি আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি নিজের কর্তৃত্বের আসনে সমাসীন হন। তিনি রাত দিয়ে দিনকে ঢেকে দেন তারপর রাতের পেছনে দিন দৌড়িয়ে চলে আসে। তিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি সৃষ্টি করেন। সবাই তার নির্দেশের অনুগত। জেনে রাখো, সৃষ্টি তাঁরই এবং নির্দেশও তাঁরই। আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী। তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক’ (সূরা আরাফ : ৫৪)।
আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই তোমাদের রব।’ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।’ আয়াতের মধ্যাংশে রবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ বিশ্ব-জগতের নিছক স্রষ্টাই নন বরং এর পরিচালক ও ব্যবস্থাপকও তিনি। তিনি এ দুনিয়াকে অস্তিত্বশীল করার পর এর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কোথাও বসে যাননি। বরং কার্যত তিনিই সারা বিশ্ব জাহানের ছোট বড় প্রত্যেকটি বস্তুর ওপর কর্তৃত্ব ও লালন-পালন করছেন। পরিচালনা ও শাসন কর্তৃত্বের যাবতীয় ক্ষমতা কার্যত তাঁরই হাতে নিবদ্ধ। প্রতিটি বস্তু তাঁর নির্দেশের অনুগত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণাও তাঁর নির্দেশ মেনে চলে। প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর ভাগ্যই চিরন্তনভাবে তাঁর নির্দেশের সাথে যুক্ত। কুরআন শাশ্বত ও অনাদি-অনন্ত সত্য উপস্থাপন করছে যে, ভূমণ্ডলে ও নভোমণ্ডলে একমাত্র আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। সার্বভৌমত্ব বলতে যা বুঝায় তা একমাত্র তাঁরই সত্তার একচেটিয়া অধিকার ও বৈশিষ্ট্য। আর বিশ্ব জাহানের এ ব্যবস্থাপনা একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা বিশেষ, যেখানে ওই একক সত্তা, সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের পূর্ণ অধিকারী। কাজেই এ ব্যবস্থার মধ্যে যে ব্যক্তি বা দল নিজের বা অন্য কারোর আংশিক বা পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবিদার হয়, সে নিজেকে নিছক প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে রেখেছে। তার পক্ষে তার রব কে, সে উত্তর সে দিতে পারবে না।
দ্বিতীয় প্রশ্ন : তোমার দ্বীন কি? দ্বীন হলো, মানুষের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থার নাম। আল্লাহর মনোনীত জীবনব্যবস্থার নাম ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন-জীবনবিধান’ (সূরা আলে ইমরান : ১৯)। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার কাছে মানুষের জন্য একটিমাত্র জীবনব্যবস্থা ও একটি মাত্র জীবনবিধান সঠিক ও নির্ভুল বলে গৃহীত। সেটি হচ্ছে, মানুষ আল্লাহকে নিজের মালিক ও মাবুদ বলে স্বীকার করে নিবে এবং তার ইবাদত, বন্দেগি ও দাসত্বের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দিবে। আর তাঁর বন্দেগি করার পদ্ধতি নিজে আবিষ্কার করবে না। বরং তিনি নিজের নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে যে হিদায়াত ও বিধান পাঠিয়েছেন কোনো প্রকার কমবেশি না করে তার অনুসরণ করবে। এই চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির নাম ‘ইসলাম’। নিজের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা আল্লাহর দেয়া ইসলামের আলোকে পরিচালনা করা হলেই কেবল দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে। মনে রাখতে হবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো মত পথ গ্রহণ করা হলে, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আরো মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে যত নবী ও রাসূল এসেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের জীবনব্যবস্থা ছিল ইসলাম।
তৃতীয় প্রশ্ন : তোমার নবী কে? হাদিসের পরিভাষায় প্রশ্নটির ধরন হবে এভাবে যে, ‘মুনকির ও নাকির ফেরেশতাদ্বয় বলবেন, এই ব্যক্তি (নবী সা:) সম্পর্কে তুমি কী বলতে? এই প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিতে হলে, দুনিয়াতে আল্লাহর রাসূলকে নিচের আয়াতের আলোকে মানতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত এবং ‘দ্বীনে হক’ দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দ্বীনকে অন্য সব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন’ (সূরা সফ : ৯)। কিন্তু যারা আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্যদের দাসত্বও করে থাকে এবং আল্লাহর দ্বীনের সাথে অন্য সব দ্বীন ও বিধানকে সংমিশ্রণ করে, তাদের পক্ষে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া আদৌ সম্ভব হবে না। বরং রাসূলকে যে জীবনবিধান দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে সেই জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হবে এবং এটিকে রাসূলের প্রদর্শিত পন্থায় অন্যান্য সব অসত্য জীবনব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে।
লেখক : প্রবন্ধকার ও গবেষক



