আবদুল কাইয়ুম
চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গত ২৩ ডিসেম্বর ভোরে একটি বসতঘরে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। বাড়িটি কাতার প্রবাসী সুখ শীল নামের এক ব্যক্তির। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর ভোর রাতে একইভাবে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ঢেউয়াপাড়া এলাকায় বিমল তালুকদার ও রুবেল দাশ নামে দুই ব্যক্তির বসতঘরে আগুন দেয়া হয়। এর আগে ১৯ ডিসেম্বর ভোররাতে কেউটিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাধন বড়ুয়া ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোনা পাল ও কামিনী মোহন পালের বসতঘরে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। সবগুলো ঘটনার দিন উঠান থেকে কেরোসিন মেশানো কাপড়, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা যায়, এসব ঘটনার নেপথ্যে ছিল আওয়ামী লীগ। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ ও নির্বাচনকে বানচাল করার জন্যই এসব ঘটনা ঘটায় বলে জানায় পুলিশ। এসব ঘটনা ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টায় সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনা ঘটানো হয়। এর নেপথ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও তাদের মদদপুষ্ট কিছু মিডিয়া রয়েছে বলে জানায় পুলিশের একাধিক সূত্র।
এ ছাড়াও নরসিংদীতে সম্প্রতি এক মুদি ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তি মনি চক্রবর্তী- যার ধর্মীয় পরিচয় সনাতন হওয়ায় ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে সাম্প্রদায়িক হামলার অপপ্রচার ছড়ানো হয়। পরে পুলিশ ও নিহতের পরিবারের প্রাথমিক তথ্যে এটি পারিবারিক কলহ ও ব্যবসায়িক পূর্বশত্রুতার জেরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে জানা যায়। সামাজি যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু বিশিষ্ট নাগরিকও যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ বিষয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে চালিয়ে দেয়।
পুলিশ জানায়, বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা স্কুল-কলেজে হামলার পরিকল্পনাও করে যাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই এমনটা প্রমাণ করা। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিরাপদ নয় তা প্রমাণ করা, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। জাতীয় নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যই তাদের মূল লক্ষ। কারণ এই জনগোষ্ঠী যদি নিরাপদ না থাকে তাহলে তারা ভোটের পরিবেশ পাবে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র মতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে ভাবছেন এই কার্যক্রমগুলো করার মাধ্যমে দেশে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের অনেক নেতানেত্রী দেশে ফেরার সুযোগ পাবেন। এখানে যারা মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থলগ্নিকারী বাস্তবায়নকারী সবার তথ্য পাওয়া গেলেও গ্রেফতার করা যায়নি। তারা বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছে। পাশাপাশি জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রমূলক পোস্ট করছে। পরিকল্পনার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন ।
এ ছাড়াও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পাহাড়ে সক্রিয় হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ (মূল)। নির্বাচনে তারা কোনো প্রার্থী দেয়ার সুযোগ না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। পার্বত্য তিন জেলায় যেসব স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, তাদের সাথে ইউপিডিএফের সংযোগ স্থাপনের খবরে এলাকায় উদ্বেগ-শঙ্কা বিরাজ করছে। বাড়ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আনাগোনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশে সাম্প্রাদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে নির্বাচন বানচাল আর সেই সাথে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরতেই এমন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে একটি মহল দীর্ঘ দিন ধরে পরিকল্পিতভাবে নানা অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের ধর্মীয় সহাবস্থানের ঐতিহ্য অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে সেই ঐতিহ্যকে দুর্বল করতে কিছু কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চায়। ধর্মের নামে সহিংসতা বা বিদ্বেষ ছড়ানো ইসলামসহ কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। গুজবে কান না দিয়ে সত্য যাচাই করা এবং যেকোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রদায়িত সহিংসতা বা উসকানির শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ আমাদের সমাজে বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভাজন রয়েছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিভিন্ন দেশেই এই বিভাজন বিদ্যমান রয়েছে। তবে আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে সামনে রেখে সহিংসতা হয়েছে। এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে, যারা এসব প্রসঙ্গগুলোকে অপ্রচার করে তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালায়। বিশেষ করে এআই ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার শঙ্কা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলোকে বিভ্রান্তমূলকভাবে প্রচার করে জনমনে ভীতি তৈরি করে।
আইনের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে পারলে কেউ এসব কাজে সাহস পাবে না জানিয়ে তিনি আরো বলেন, যারা নিজেদের লক্ষ পূরণের জন্য এসব কর্মকাণ্ড ঘটাবে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রয়োগ করলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। অনেক সময় নিজেদের সমস্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব হলেও সেটাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। অনেকে হামলার ঘটনা যাচাই বাছাই না করে প্রভাবিত হয়ে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে যায়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্নভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই ভয় ও আতঙ্ক দূর করতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। গত ১৭ থেকে ১৮ মাসে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। দেশের প্রত্যেক মানুষ যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করে, তবে সেখানে গণতন্ত্র অর্থহীন।



