বড়ত্বের গৌরবে আমাদের কাঁঠাল : আয়াজ আহমদ বাঙালি

Printed Edition
বড়ত্বের গৌরবে আমাদের কাঁঠাল : আয়াজ আহমদ বাঙালি
বড়ত্বের গৌরবে আমাদের কাঁঠাল : আয়াজ আহমদ বাঙালি

গাছে জন্মানো ফলগুলোর মধ্যে কাঁঠালই সবচেয়ে বড়। আকারে বিশাল, ঘ্রাণে স্বতন্ত্র, স্বাদে অতুলনীয় এবং পুষ্টিতে সমৃদ্ধ হওয়ায় কাঁঠাল মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। শুধু ফল হিসেবেই নয়, নানা খাবার ও রান্নায় ব্যবহারের জন্যও কাঁঠালকে ফলের রাজা বলা হয়। কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। গ্রামীণ জীবন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে এই ফলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম আর্টোকার্পাস হেটেরোফাইলাস। এটি মোরেসি পরিবারের সদস্য। উৎপত্তিস্থল ভারতের পশ্চিমঘাট অঞ্চল, যেখান থেকে হাজার বছর আগে এটি ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

একটি পরিপক্ব কাঁঠালের ওজন ৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে বড় কাঁঠালের ওজন ছিল ৫২ কেজিরও বেশি। গাছের গুঁড়ি থেকে শুরু করে মোটা ডালেও কাঁঠাল ধরে। এটি প্রকৃতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। একটি পরিপক্ব কাঁঠাল গাছ বছরে ১০০ থেকে ২০০টি পর্যন্ত ফল দিতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। ঢাকা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল জেলায় কাঁঠালের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা ‘কাঁঠালের রাজধানী’ নামে পরিচিত।

পুষ্টিগুণের দিক থেকে কাঁঠাল অসাধারণ। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে আছে শর্করা ২৩.২৫ গ্রাম, প্রোটিন ১.৭২ গ্রাম, ভিটামিন সি ১৩.৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৪৪৮ মিলিগ্রাম এবং ম্যাগনেশিয়াম ২৯ মিলিগ্রাম। কাঁঠালে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন বি-৬, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক। কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড়ে থাকা জ্যাকলিন নামক যৌগ ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার একে বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছে। পাকা কাঁঠালের কোষ সরাসরি খাওয়া হয় এবং জুস, জ্যাম ও পায়েস তৈরিতে ব্যবহার হয়। কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড় তরকারি হিসেবে রান্না হয়, যার স্বাদ অনেকটা গোশতের মতো। এই কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে এঁচোড় এখন ‘ভেগান মিট’ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বিবিসি ও গার্ডিয়ান পত্রিকায় কাঁঠালকে ‘সুপার ফুড অব দ্য ফিউচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

কাঁঠালের বীজও পুষ্টিকর খাবার। সিদ্ধ করে বা ভেজে খাওয়া হয় এবং তরকারি হিসেবেও। কাঁঠাল গাছের কাঠ অত্যন্ত মজবুত এবং পোকা-প্রতিরোধী, তাই আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মৃদঙ্গ বাদ্যযন্ত্র তৈরিতেও কাঁঠালের কাঠ ব্যবহার হয়।

পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও কাঁঠাল গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি পরিবেশবান্ধব ফসল। সার ও কীটনাশক ছাড়াই বাড়ির আঙিনায় জন্মায়। জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে যখন খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে, তখন কাঁঠালের মতো উচ্চফলনশীল, পুষ্টিকর ও কম যতেœর ফসল আশার আলো দেখাচ্ছে। কাঁঠাল সম্পর্কে এমন কিছু বিস্ময়কর তথ্য রয়েছে, যা জানলে এই সাধারণ ফলটিকে আর সাধারণ মনে হবে না। পৃথিবীর বহু দেশে কাঁচা কাঁঠালকে ট্রি মেট বা গাছের গোশত বলা হয়। কারণ এর আঁশযুক্ত ভেতরের অংশ রান্না করার পর অনেকটা খাসি বা মুরগির গোশতের মতো অনুভূতি দেয়। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার নিরামিষভোজীদের কাছে কাঁঠাল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বার্গার, ট্যাকো কিংবা বিভিন্ন ফাস্টফুড তৈরিতে এটি এখন গোশতের অন্যতম সেরা বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও কাঁঠাল এক বিস্ময়। সাধারণ ফলের মতো এটি ডালে ধরে না; বরং সরাসরি গাছের প্রধান কাণ্ড বা গোড়ায় জন্মায়। বিশাল ও ভারী ফলকে ধারণ করার জন্য প্রকৃতি কাঁঠাল গাছকে এই বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। আরো অবাক করার বিষয় হলো, কাঁঠাল আসলে একক ফল নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি একটি ‘যৌগিক ফল’ বা ‘মালটিপল ফ্রুট’। অর্থাৎ হাজার হাজার ক্ষুদ্র ফুল একত্র হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঁঠাল সৃষ্টি করে। আমরা যে প্রতিটি কোয়া খাই, সেগুলো আসলে আলাদা আলাদা ক্ষুদ্র ফল। কাঁঠালের আরেকটি রহস্য তার আঠালো কষে। এই ল্যাটেক্স এতটাই শক্তিশালী যে, প্রাচীনকালে মানুষ এটি প্রাকৃতিক আঠা বা সুপারগ্লু হিসেবে ব্যবহার করত। পাখি ধরার ফাঁদ তৈরি থেকে শুরু করে ভাঙা জিনিস জোড়া লাগাতেও এই কষ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। এ কারণেই কাঁঠাল কাটার আগে হাতে ও ছুরিতে সরিষার তেল মাখার ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যাতে আঠা সহজে না লাগে।

কাঁঠালের সাথে ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। কাঁঠাল গাছের কাঠ থেকে বিশেষ ধরনের হলুদ রং তৈরি হয়, যা অতীতে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের পোশাক রাঙাতে ব্যবহৃত হতো। শুধু তাই নয়, মোগল সম্রাট বাবর তার বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’তে কাঁঠালের স্বাদের উচ্চ প্রশংসা করেন।

তাই কাঁঠাল এক দিকে খাদ্য, অন্য দিকে ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও স্মারক। বর্তমান বিশ্বে কাঁঠালকে পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গম, ধান ও ভুট্টার উৎপাদন হুমকির মুখে পড়লেও কাঁঠাল গাছ খরা ও উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও টিকে থাকতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভবিষ্যতে খাদ্য সঙ্কট ও ক্ষুধা মোকাবেলায় কাঁঠাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পুষ্টিতে সমৃদ্ধ, ফলনে অধিক এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় কাঁঠালকে প্রকৃতির বিশেষ উপহার বলা হয়।

কাঁঠালের মৌসুমে বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে যে আনন্দ, সমৃদ্ধি এবং ভাগাভাগির সংস্কৃতি দেখা যায় তা অন্য কোথাও নেই। একটি বড় কাঁঠাল কাটলে পাড়ার সবাই পায়, কেউ বঞ্চিত থাকে না। এই উদারতাই কাঁঠালকে করেছে ফলের রাজা। হ