বিশ্ব গণমাধ্যমের নজরে বাংলাদেশের নির্বাচন

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশেষ দৃষ্টি কেড়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক পটভূমি, সম্ভাব্য ফলাফল, চ্যালেঞ্জ এবং একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে জনগণের প্রত্যাশা- এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলো।

জুলাই অভ্যুত্থানের ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ও সংস্কারভিত্তিক গণভোট পর্যবেক্ষণে প্রায় ৪০০ বিদেশী পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি প্রায় ২০০ বিদেশী সাংবাদিক মাঠে কাজ করেছেন। ফলে নির্বাচনটি কেবল জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ‘বাংলাদেশ হোল্ডস ইলেকশন অন থার্সডে. হেয়ার ইজ হোয়াট টু নোও’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, অনেক বাংলাদেশী এই নির্বাচনকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন- যেখানে স্বৈরাচার ও ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে, এবার বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করায় নির্বাচনটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঠে প্রধান শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন বলেও ইঙ্গিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

একই সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থানও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। জনগণের একটি অংশের ক্ষোভ ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে দলটি উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্য দিকে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেয়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির বিষয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী ও উদারপন্থী ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে এখনো সংগ্রাম করছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান নির্বাচন-পূর্ব দু’টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একটি প্রতিবেদনে ‘ওমেনস ফ্রিডম আর অ্যাট স্টেক’ শিরোনামে সতর্ক করে বলা হয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের স্বপ্নের বিপরীতে ‘রক্ষণশীল ইসলামপন্থী’ রাজনীতির পুনরুত্থানে নারীদের অধিকার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাদের জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিক ভোট পেতে পারে এবং নির্বাচনের পর বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে ইঙ্গিত ছিল।

গার্ডিয়ানের আরেকটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে তারেক রহমান ‘টপ-ডাউন, জিরো টলারেন্স’ দুর্নীতিবিরোধী নীতি এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে আগামী সরকারের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

বিবিসি নিউজ জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করতে হবে। একই সাথে জনগণের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ও সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাদের ওপর বর্তাবে।

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস বলেছে, এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। অনেক ভোটার আশা করছেন- আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব ফিরে আসবে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণ এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে কিছুটা সফল হলেও নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি- এমন সমালোচনাও রয়েছে।

একইভাবে সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে, ‘জেন-জি ওউন দ্যা রেভ্যলুশন- দ্য ওল্ড গার্ড ইজ ডোমিনেটিং দ্যা ইলেকশন’ অর্থাৎ তরুণ প্রজন্ম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নির্বাচনের ময়দানে আবারো পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। নতুন দলগুলো এখনো সংগঠিত শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ বলছে- বাংলাদেশের এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।