কূটনৈতিক প্রতিবেদক
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার অবস্থান নির্ধারণে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছে। একদিকে ইরানের ওপর এ আক্রমণের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য দিকে ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর লক্ষ্য করে ইরান বিরামহীনভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমানকে নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভ্ক্তু (জিসিসি) দেশগুলোর বেসামরিক নাগরিক হতাহত এবং স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা ঘটছে। আর এ জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতেই বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশের বসবাস।
এ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। তবে নানা মহলের সমালোচনার মুখে দ্বিতীয় দিনের বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন। সরকার ভ্রাতৃপ্রতীম ইরানের জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছে। অন্য দিকে ইসলামী সহযোগতিা সংস্থা (ওআইসি) এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার সরাসরি নিন্দা জানাবে- এমনটা প্রত্যাশা করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে ইরান ইস্যুতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেয়ার তাগাদা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তিসহ বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে যে চুক্তিই করে থাকুক না কেন, নির্বাচনের পর সংসদে এগুলো নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রয়েছে।
এ সব ব্যাপারে গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেছেন, ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের দেয়া বিবৃতি একদিকে ঠিক আছে। কারণ আমাদের স্বার্থ যেখানে বেশি, সেটাকেই আমরা প্রাধান্য দেবো। অন্তর্বর্তী সরকারের পর বর্তমান সরকারও বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে কিছুটা ঝুঁকে রয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে সেটাই প্রতীয়মান হয়। তবে পররাষ্ট্র নীতি এবং বিশেষ করে ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কূটনীতিতে খুবই কৌশলী হতে হয়, যাতে সরকার যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরবের দিকে ঝুঁকে থাকলেও তা প্রকাশ্যে না আসে। সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের বোঝাতে সক্ষম হতে হবে যে, বাংলাদেশ সব পক্ষের সাথে কমবেশি আছে। কূটনীতিতে এমন অনেক শব্দের ব্যবহার হয়, যাতে প্রয়োজন হলে একাধিক ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। তাই আমি মনে করি, ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে দেয়া বিবৃতিতে বাংলাদেশকে আরো সতর্ক ও কৌশলী হওয়া উচিত ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইরান ইস্যুতে পরপর দুইদিন দেয়া বিবৃতিতে দু’টিতে এ বিষয়টির ঘাটতি লক্ষ করা গেছে।
তিনি বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারের অনেকের মধ্যে অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে, যা বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে অর্জন করতে হয়। জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর ইরানের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম বিবৃতি দেয়া হয়েছে। কেননা এ সব দেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজ করেন। দ্বিতীয় বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে একটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কাজটা প্রথম বিবৃতিতেই করা সম্ভব ছিল।
সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের পরবর্তী সভাপতি পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তোমরা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও নাই। এ ছাড়া আমাদের কাছের বা দূরের অনেক দেশ রয়েছে যারা বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। তখন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা আমাদের প্রয়োজন হবে, যেটা আমাদের অতীতের দুর্বল অবস্থানের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর সম্পর্কে মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর শুভেচ্ছা বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও সামরিক চুক্তির জন্য তাগাদা দিয়েছেন। পল কাপুরের সফরটি তারই ধারাবাহিকতা। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের বর্তমান স্থিতিশীল পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ অনুকূল পরিবেশেই যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তাগাদা দিয়ে আসা সামরিক চুক্তি সই জন্য এ সময়টাকে যুক্তরাষ্ট্র সঠিক বলে মনে করছে। এখনই এ ব্যাপারে অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশ পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে ইস্যুগুলো থেকে সরে যেতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) নির্বাচনের আগে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এখন রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে ভিন্ন অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অভিজ্ঞ এ কূটনীতিক বলেন, নির্বাচনের আগে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দেশে-বিদেশে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। তবে তাদের মূল নজর থাকে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচারণাসহ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য নানা ধরনের কৌশল প্রয়োগের দিকে। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলো দলের অভ্যন্তরে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে বাণিজ্য চুক্তি সই হওয়ায় এটা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলো পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশীদের সাথে যে চুক্তিই করে থাকুক না কেন, নির্বাচনের পর সংসদে এগুলো নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জুলাই সংস্কার সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সই হওয়া চুক্তিগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের জন্য যদি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে চুক্তি নিয়ে আলাপ-আলোচনা সম্ভব না হয়ে থাকে, তবে চুক্তিগুলো নির্বাচনের পরে সই হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। এ রায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তির কী ধরনের প্রভাব ফেলবে- জানতে চাওয়া হলে মাহফুজুর রহমান বলেন, এ ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের চেয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রাধান্য পেতে পারে।


