নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতির উদ্দেশে নির্বাচনী ভাষণ দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের শাপলা প্রতীকের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি বিচারহীনতার অবসান, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং একটি ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।
ভাষণের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা, আইনের প্রয়োগ এবং সুযোগ বণ্টনের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ।
তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি ক্ষুদ্র ক্ষমতাবান গোষ্ঠী রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছে। বিপরীতে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দীর্ঘ দিন ধরে বঞ্চনার শিকার হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনাও রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রাম ও মফস্বল এলাকার মানুষ ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভাষণে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এসব অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তারা যেই বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানেরই হোক না কেন সবাইকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে লুটপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি বলেন, বিগত শাসনামলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে এসব পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে তিনি জানান।
পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে নতজানু পররাষ্ট্র নীতি থেকে বের করে এনে স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতির পথে এগিয়ে নেয়া হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ সব দেশের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। একই সাথে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে সার্ক পুনরুজ্জীবন এবং আসিয়ানে যোগদানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলেন।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট দায়ী। এসব সিন্ডিকেট ভেঙে ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দমন, ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন ।
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কারে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জননিরাপত্তার গণসংস্থায় রূপান্তরের ঘোষণা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত শাসনামলে পুলিশ একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। সরকার গঠনের পর পুলিশের কাঠামো পুনর্গঠন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং মানবিক পুলিশিং চালুর পরিকল্পনা নেয়া হবে।
বিচার বিভাগ সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, বিচার পেতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিচারক নিয়োগ বাড়ানো, ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থা চালু এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করে বিচার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।
শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ক্ষমতা রাজধানী কেন্দ্রিক না রেখে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত ক্ষমতা দিলে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানো সম্ভব হবে ।
ভেজালবিরোধী অবস্থানে তিনি বলেন, দেশে প্রায় সব খাদ্যপণ্যেই ভেজাল রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ, দ্রুত বিচার, লাইসেন্স বাতিল ও নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষা করা হবে।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, নারীর সমঅধিকার, পোশাকের স্বাধীনতা এবং ঘৃণাবিরোধী নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী ও সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবেই এগিয়ে যাবে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ভবন নয় সেবার মান উন্নয়নই হবে অগ্রাধিকার। সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে এবং যোগ্য পেশাজীবীদের মাধ্যমে এই খাতগুলো পুনর্গঠন করা হবে।
ভাষণের শেষ অংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণ যদি এনসিপির ওপর আস্থা রাখে, তবে বৈষম্য, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে- যেখানে রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।



