স্কুলশিক্ষার্থীদের অসহিষ্ণু আচরণে বাড়ছে উদ্বেগ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

  • আইডিয়ালের এক ছাত্রকে বেধড়ক মারধর
  • উত্তরায় বাবার সামনে মেয়েকে অপহরণ

শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, এখন স্কুল পর্যায়ের টিনএজ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দিনকে দিন অসহিষ্ণু আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ এমনকি সহপাঠীকে জীবননাশের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে তারই সহপাঠীরা একত্র হয়ে হামলা করে মারাত্মকভাবে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর উত্তরায় এক স্কুল পড়–য়া ছাত্রীকে বাবার সামনে থেকে অপরহণ করে ৯ দিন গুম করে রাখার পর সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়েছে। এমন নানা ঘটনা আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুলের ইংরেজি ভার্সনের নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে তারই সহপাঠীরা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। সাদমান জারিফ নামের এই মেধাবী শিক্ষার্থী মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের নবম শ্রেণীর ইংরেজি ভার্সনের এফ শাখায় অধ্যয়নরত। তার রোল নং-৩০। গত ১৮ এপ্রিল শাহজাহানপুর থানাধীন শাহজাহানপ্রু মা মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় ইমরান স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যায়। পড়া শেষ করে পাশেই আরেক টিচার আবদুর রব স্যারের রুমে বাংলা পড়তে যাওয়ার সময়েই তারই চার-পাঁচজন সহপাঠী আগের একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাকে টেনেহেঁচড়ে ভবনের নিচে নিয়ে মারাত্মকভাবে মারধর করে। ঘটনা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, অল্পের জন্য সাদমান জারিফ প্রাণে বেঁচে গেছে। আর মারধরের এই ঘটনা আক্রমণকারী শিক্ষার্থীরাই ভিডিও ধারণ করে তার বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় সাদমানকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বর্তমানে সে অনেকটাই ট্রমার মধ্যে রয়েছে। ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২০ এপ্রিল সাদমানের মা শাহানা আক্তার নিজেই শাহজাহানপুর থানায় একটি ডায়েরি করেছেন। জিডি নং-১০৪২, তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬ইং, শাহজাহানপুর থানা। একই সাথে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে দোষীদের বিচার দাবি করে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বরাবরেও লিখিত আবেদন করেছেন। থানায় ডায়েরি এবং স্কুলের আবেদনে আক্রমণকারী হিসেবে চার-পাঁচজনের নাম উল্লেখ করেছেন সাদমানের মা শাহানা আক্তার। তারা হলেন- তাফসিন (শাখা এফ), মুন্সি আবরার মাহির (সেকশন-ই), আবদুর রহমান (সেকশন-ই) রিসাদ আহমেদ (সেকশন জি), মারুফ মোরশেদ (সেকশন জি), ইশমাম আহমেদ অদিত (সেকশন এফ)। তাদের সাথে আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীও ছিল। ঘটনার পর থেকে সাদমান ও তার পরিবার এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সাদমানের বাবা-মা ছেলের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে স্কুল প্রধানের কাছে পৃথক একটি আবেদনও জমা দিয়েছেন। এ দিকে সাদমান জারিফের ওপর এই নির্মম আক্রমণের একটি ভিডিও ক্লিপ নয়া দিগন্ত অফিসেও সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে দেখা গেছে উল্লিখিত শিক্ষার্থীরা সাদমানের উপর অতর্কিতভাবেই আক্রমণ করেছে। তাকে কিল ঘুষি এমনকি মাথায়ও আঘাত করা হয়েছে। এক পর্যায়ে সে রাস্তায় পড়ে গেলেও তার ওপর আক্রমণ বন্ধ করেনি তারা। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ওইদিন বড় কোনো দুর্ঘটনা বা জীবনহানির মতো আরো বড় ঘটনাও ঘটতে পারত।

এ বিষয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশন জাহান গত রোববার রাতে এই প্রতিবেদককে জানান, আমরা ইংরেজি ভার্সনের সংশ্লিষ্ট ক্লাস টিচারকে দায়িত্ব দিয়ে তিনজনের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলাম। যেহেতু ঘটনাটি আমাদের স্কুল কম্পাউন্ডের ভেতরে ঘটেনি। কিন্তু তার পরেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখেই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সবার বক্তব্য নিয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে আমরা শাস্তিুমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। এরইমধ্যে একজনকে ছয় মাসের জন্য একজনকে চার মাসের জন্য এবং অন্য একজনকে তিন মাসের জন্য ক্লাস থেকে সাসপেন্ড করেছি। তারা এখন থেকে আর ক্লাস করতে পারবে না। আর তারা নতুন বছরে অন্য শাখায় চলে যাবে এই শাখায় আর ভর্তি হতেও পারবে না। একই সাথে এই তিন শিক্ষার্থী এখন থেকে কোনো ক্লাস টেস্ট বা সিটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। শুধু ষাণ¥াসিক এবং বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে অন্য শাখায় চলে যাবে। এই শাখায় তারা আর ভর্তি হতে পারবে না।

অপর দিকে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টর থেকে গত ২২ এপ্রিল বাবার কাছ থেকে এক মেয়ে শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে নিয়ে যায় কয়েকজন যুবক। জানা গেছে, মেয়েটি উত্তরা হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ঘটনার পরে অবশ্য মেয়ের বাবা মো: কামরুজ্জামান উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারে গাজীপুরের গফুর মার্কেট এলাকা থেকে গত ১ মে মূল আসামিসহ মেয়েটিকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন পুলিশ। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। অনেকে বলছেন সমাজে যেভাবে কিশোর গ্যাং বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা শুধু এখন দিন বা রাত নয় কোনো সময়েই কেউ-ই আর নিরাপদ নয়। বিষয়টি অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলছে। এসব বিষয়ে এখন থেকেই সামাজিক আন্দোলেনর পাশাপাশি সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধির উপরেও গুরুত্ব দিতে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী মো: বরকত আলী বর্তমানের সামাজিক এই অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে এই প্রতিবেককে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে এই ধরনের অন্যায় অপরাধ রোধ করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না হলে কিংবা এগুলোর অপব্যবহার হলে আমাদের শিক্ষার্র্থীদের মধ্যে তাদের সঠিক মূল্যবোধও তৈরি হবে না। এই শিক্ষাবিদ আরো মনে করেন, সমাজে বড়দের আচরণও ছোটদের মনে রিফ্লেক্ট (প্রতিফলন) করে। তাই বড়রা সমাজে যদি ভালো কাজ ভালো আচরণ নিয়ে এগিয়ে আসে তাহলে ছোটরা বা আমাদের শিক্ষার্র্থীদের আচরণেও পরিবর্তন আসবে। মনে রাখতে হবে সমাজে একজন শিক্ষিত মানুষের চেয়ে মানবিক মূল্যবোধের অধিকারী মানুষ বেশি প্রয়োজন।