শ্রেণিকক্ষের বাইরে বিকল্প হয়ে উঠছে কোচিং ও টিউশন

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

  • শিক্ষার্থী টানতে প্রতিষ্ঠানের বাইরে আরেক শিক্ষাবাজার
  • অনলাইন-অফলাইন ২ পদ্ধতিতেই চটকদার বিজ্ঞাপন
  • লাগাম টানতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের হুঁশিয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর

পড়াশোনা চলে গেছে শ্রেণিকক্ষের বাইরে। প্রাইভেট টিউশন আর চটকদার কোচিংয়ের মোহে স্কুল কলেজের চার দেয়ালের ভেতরে মন বসে না শিক্ষার্থীর। বাবা মায়ের পকেট উজাড় করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দিয়ে প্রতিটি পরিবারের কোনো না কোনো শিক্ষার্থী এখন বছরব্যাপীই প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে নির্ভর হয়ে পড়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে এ যেন মূল শিক্ষার বিকল্প হয়ে উঠছে প্রাইভেট কোচিং ও টিউশন। শিক্ষার্থী টানতে অনলাইনেও এখন প্রচার করা হয় চটকদার বিজ্ঞাপন। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও এ যেন আরেক শিক্ষাবাজার। যদিও এসব কোচিং এবং প্রাইভেট টিউশনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিজেই। কিন্তু তারপরও বন্ধ হচ্ছে না প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং।

অবশ্য সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট কোচিং এবং টিউশন নিয়ে বলেছেন, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানপদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে ক্লাসের পড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থী ক্লাসেই শতভাগ বুঝে নিতে পারে। তাকে যেন বাইরের কোনো শিক্ষক বা টিউশন কোচিংয়ের প্রয়োজন না হয়। তার জন্য শিক্ষকদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কিংবা তাদের আর্থিক সুবিধাও বাড়িয়ে দেয়া হবে। তিনি বলেছেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নেয়া হবে যেখানে কোনো কোচিং টিউশন বা বাজারের আলাদা কোনো নোট-গাইড আর দরকার হবে না। শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বিকল্প কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে মুখস্থনির্ভরতা ও গাইডবই নির্ভরতা থেকে বের করে আনা হবে। শিক্ষামন্ত্রী তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আরো জানান, আমরা চেষ্টা করছি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আরো কার্যকর করা, যাতে শিক্ষার্থীরা আলাদা কোচিং বা টিউশনের ওপর কম নির্ভরশীল হয়। শিক্ষকদের মাধ্যমে নোট-গাইড থেকে প্রশ্ন তৈরি বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্র্যাকটিক্যালভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া। তার মতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই কেবল টিউশননির্ভর শিক্ষার এই আকর্ষণ কমিয়ে আনা যাবে।

এদিকে বর্তমানে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামী দুই মাস পর থেকেই শুরু হবে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এই দু’টি পাবলিক পরীক্ষা ঘিরে দেশের অধিকাংশ অভিভাবকদের মধ্যেও একটি উত্তেজনা ও মানসিক ভীতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক অভিভাবকই চান তার সন্তান ভালো ফলাফল অর্জন করুক। এ কারণেই তারা শ্রেণিকক্ষের বাইরেও সন্তানের অতিরিক্ত কোনো কিছুর ঘাটতি থাকলে তা দেয়ার চেষ্টা করেন। ফলে অভিভাবকগণ বাধ্য হয়েই কোচিং কিংবা প্রাইভেট টিউশনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অনেক অভিভাবকতো এটাকে তার বাচ্চার জন্য জরুরি বলেও দাবি করেছেন। তবে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন এখন প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় অংশ নির্ভর করছেন ব্যক্তিগত টিউশন বা কোচিং সেন্টারের ওপর। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সরকারি বিভিন্ন জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই নির্ভরতা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে না; বরং এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটেও পরিণত হয়েছে।

শিক্ষকদের মধ্যেও অনেকে মনে করেন বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে প্রাইভেট টিউশন নিচ্ছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান দুর্বল হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিংমুখী হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিউশন নির্ভরতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত না হওয়া। অনেক স্কুল ও কলেজে শিক্ষকসঙ্কট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং মানসম্মত মূল্যায়নের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির জন্য আলাদা সহায়তা খুঁজছে। দ্বিতীয়ত, পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করছে। এই চাপকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিশাল কোচিং বাণিজ্য।

শিক্ষকদের একটি সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকায় অনেক পরিবার তাদের মাসিক আয়ের বড় অংশ ব্যয় করছে সন্তানের প্রাইভেট টিউশনের পেছনে। নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক রাখতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা ধীরে ধীরে বৈষম্যমূলক হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম পরিবারগুলো বেশি সুবিধা পেলেও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে কোচিংনির্ভরতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগী। সৃজনশীল চিন্তা, গবেষণা বা ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করাই হয়ে উঠেছে প্রধান লক্ষ্য। ফলে শিক্ষার গুণগত মান প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকেরাই শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত টিউশনে আসতে উৎসাহ দেন। যদিও সরকার শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতিমালা করেছে, বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ খুব সীমিত। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতার অভাবের কারণেই এই পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে কোচিং সেন্টারগুলো প্রায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হচ্ছে। এসএসসি, এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মৌসুমি ব্যবসাও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে টিউশন নির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। এজন্য শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। একই সাথে শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস চালুরও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাইভেট টিউশন এখন আর শুধু সহায়ক মাধ্যম নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে মূল শিক্ষার বিকল্প হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষা সমতা, মান এবং নৈতিকতার প্রশ্নে নতুন করে ভাবতে হবে নীতিনির্ধারকদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রেণিকক্ষকেই যদি কার্যকর শেখার প্রধান জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে টিউশন বাণিজ্য আরো বিস্তৃত হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে।

দেশের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আযাদ খান মনে করেন কোচিং বা টিউশন বন্ধ করতে আইন করে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। কেননা অভিভাবকদের অনেকেই বাচ্চার দুর্বলতার কারণেই কোচিং বা টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হন। নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে তিনি আরো জানান, ক্লাসরুমের মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বাইরের কোচিংকে নিরুৎসাহিত করা যাবে। আমার বিবেচনায় আইন করার পাশাপাশি ক্লাসরুমের শিক্ষার ওপরেও গুরুত্ব দেয়া জরুরি।