এস এম রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রাম
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির মুখে দেশ দ্রুত এগিয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এলেও সাত বছর আগে বাপাউবোর গৃহীত সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্পের খবর নেই।
জানা গেছে, বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী এর অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে : ওয়ার্ল্ড ক্ল¬াইমেট রিস্ক ইনডেক্স (ডড়ৎষফ ঈষরসধঃব জরংশ ওহফবী) বলছে সাধারণত বাংলাদেশ এই সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে থাকে। কিছু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-২০১৯ সময়কালে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে ছিল। সর্বশেষ তথ্য (২০২৪/২০২৫) : বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায় জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ও চরম দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের জন্য প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কারণে ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার ঘনত্বের দরুন বাংলাদেশে বহুমাত্রিক এবং ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বাংলাদেশের প্রায় ১১% থেকে ১৭% উপকূলীয় ভূমি পানির নিচে চলে যেতে পারে। ফলে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত বা ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হতে পারে। দেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা সঙ্কট : উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে আবাদি জমি অনুর্বর হয়ে পড়বে, ইতোমধ্যে যা শুরু হয়েছে। খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং অসময়ে বন্যার কারণে দেশের প্রধান ফসল ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যা তীব্র খাদ্যসঙ্কট তৈরি করতে পারে। তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সি (ঘনত্ব) বহুগুণ বেড়ে যাবে। হিমালয়ের বরফ গলা এবং অতিরিক্ত মৌসুমি বৃষ্টির কারণে নদীভাঙন ও আকস্মিক বন্যা দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করবে। সুপেয় পানির চরম অভাব : ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং উপকূলীয় এলাকার নদী ও নলকূপের পানিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ার কারণে কোটি কোটি মানুষ বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র সঙ্কটে পড়বে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মহামারী : লবণাক্ত পানি পানের কারণে গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সাধারণ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। বন্যা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, ডেঙ্গু এবং হিটস্ট্রোকের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বাড়বে। অর্থনৈতিক ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি : বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি খাতের এক-তৃতীয়াংশ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে তার বিপুল জীববৈচিত্র্য হারাতে পারে।
জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর সে কারণে উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু বরফপুঞ্জ গলছে আর সেই সাথে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে প্রকৃতির আচরণ ক্রমান্বয়ে রুক্ষ থেকে রুক্ষতর হয়ে উঠছে। এতে প্রতি বছর দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষতিসহ সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়ে আসছে।
জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে; তারই অংশ হিসেবে আগামী ১০০ বছরের টেকসই উন্নয়ন ও উপকূল সুরক্ষার বিষয়টিকে প্রধান্য দিয়ে সরকার ডেল্টা প্ল্যান প্রণয়ন করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বৈশিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ছাড়াও প্রাকৃতিক কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায়, সরকারিভাবে জলবায়ু পরিবতর্নের ঝুঁকি মোকাবেলায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা ২০০৯ (বিসিসিএসএপি-২০০৯) চূড়ান্ত করা হয়, যা উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম এই ধরনের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগে তা বাস্তবায়নে ২০০৯-১০ অর্থবছরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (সিসিটিএফ) গঠন করা হয়।
মূলত তারই আলোকে বাপাউবো নিজস্ব দীর্ঘতম বেড়িবঁাঁধকে কেন্দ্র করেই ওই সুপার ডাইক প্রকল্পটি প্রণয়ন করেছিল। এতে সম্ভাব্য ব্যয় হবে ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার বা ৬০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-এর মধ্য সময়ে প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পাউবো চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক। তিনি এই প্রকল্পে চীন অর্থায়ন করছে জানিয়ে বলেন, ২০১৯ সাল থেকে বাপাউবো সুপার ডাইক প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে।
আপাতত কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মিরেরসরাই পর্যন্ত চার লেনের সড়কসহ সুপার ডাইক বাস্তবায়ন করা হবে সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাউবো।
জানা গেছে, পাউবোর সুপার ডাইক প্রকল্পটিতে ওই সময়ে অর্ধায়নের জন্য বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরে সুপার ডাইকের পরিবর্তে কক্সবাজার থেকে মিরেরসরাই পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ নির্মাণের উদ্যোহ নেয়া হয়। ওই সময়ে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ‘আলোর মুখ দেখছে পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিনড্রাইভ প্রকল্প’ শিরোনামে নয়া দিগন্তে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড বঙ্গোপসাগর উপকূল কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে জেলার মিরেরসরাই এবং ফেনীর রেগুলেটর থেকে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর ও পুরো হাতিয়াসহ ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ মিটার উঁচু করে সুপার ডাইক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল পাউবো।
২০১৯ সালের শুরুতে পাউবো কক্সবাজার মেরিনড্রাইভ থেকে মিরেরসরাই এবং ফেনী রেগুলেটর থেকে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর পর্যন্ত (পুরো হাতিয়ার ৮৬ কিলোমিটারসহ) ৬৪২ কিলোমিটার দুইমুখী সড়কসহ গড়ে ১০ মিটার উঁচু করে সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প প্রণয়ন এবং নানা ধরনের সমীক্ষাসহ প্রাথমিকভাবে প্রজেক্ট প্রোফাইল প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ওই প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা সম্পন্নের পাশাপাশি পাউবোর কারিগরি কমিটিও ওই প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। আগ্রহী দাতা দেশগুলোর কাছে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানোর জন্য ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছিল। ওই সময়ে নেদারল্যান্ডস ও চীন উপকূল সুরক্ষা প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে তাদের আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি জানিয়েছিল পাউবোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের।
ওই সময়ে প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা, প্রকল্প অনুমোদন, আগ্রহী দাতা দেশের কাছে প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নের মধ্যদিয়ে আরো এক ধাপ এগিয়েছিল উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্পটি।
প্রথম পর্যায়ে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ হাজার ১৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মিরেরসরাই পর্যন্ত ৪৩০ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৪ হাজার ৩৬ কোট ৮৩ লাখ টাকা এবং অপর অংশে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার ও পুরো হাতিয়া উপকূলের ৮৬ কিলোমিটারসহ ২১২ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।
সমন্বিতভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত চট্টগ্রাম কক্সবাজার থেকে শুরু করে নোয়াখালীর হাতিয়া জেলা পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষার পাশাপাশি এই সুপার ডাইক কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে নতুন বিপ্লবের সূচনা ঘটবে। জেলার মিরেরসরাই বাস্তবায়নাধীন শিল্পনগরী সীতাকুণ্ড ইকোনমিক জোন, কোরিয়ান ইপিজেড, চট্টগ্রাম বন্দর, বাঁশখালীতে নির্মিত কোল পাওয়ার প্লান্ট, কক্সবাজার জেলার মগনামাঘাট এলাকায় নৌবাহিনীর সাবসেনি স্টেশন, ধলঘাট এলএনজি টার্মিনাল ও কোল পাওয়ার স্টেশন, মহেশখালীর মেগা সিটি প্রকল্প, সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজমসহ শিল্প এলাকায় পুরো উপকূলীয় এলাকা সবধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করবে এবং নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপনের মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে সুপার ডাইক। এ ছাড়া গৃহীত সুপার ডাইক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, ধলঘাট ও মহেশখালী দ্বীপ পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলের সামগ্রিক মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে উপকূলীয় এলাকার সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।



