রুহুল আমিন সৌরভ কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ইতিহাসের পাতায় একসময় সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল নলডাঙ্গা রাজবংশ। রাজপ্রাসাদ, পরিখাবেষ্টিত নিরাপত্তাব্যবস্থা, সৈন্যবাহিনী এবং নদীপথের গোপন সংযোগ সব মিলিয়ে ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাজকীয় স্থাপনা। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিক্রমায় সেই রাজ্যের অধিকাংশ নিদর্শন আজ বিলীন। কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে কেবল কয়েকটি প্রাচীন মন্দির, যেগুলোও এখন সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে নলডাঙ্গা ইউনিয়নের খড়াসিং গ্রামে অবস্থিত নলডাঙ্গা রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। একসময় যেখানে ছিল সুসজ্জিত রাজপ্রাসাদ, সেখানে এখন কৃষিজমি ও ইটভাটার বিস্তার। রাজবাড়ী বহু আগেই নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের চিহ্ন প্রায় মুছে গেলেও বেগবতী নদীর তীরে এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারামণি, বিষ্ণু ও রাজেশ্বরী মন্দিরসহ আটটি প্রাচীন মন্দির।
স্থানীয় উদ্যোগে কয়েকটি মন্দির সংস্কার করা হলেও ইতিহাসবিদদের মতে, যথাযথ গবেষণা ও প্রতœতাত্ত্বিক তত্ত্বাবধানের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে স্থাপনাগুলোর মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক মূল্য ও প্রাচীনত্বের অনেক উপাদান হারিয়ে যাচ্ছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় পাঁচশ বছর আগে ফরিদপুর অঞ্চলের ভবরাসুর গ্রামের ভট্টরায়ন বংশের উত্তরসূরি বিষ্ণুদাস হাজরা নলডাঙ্গা রাজবংশের ভিত্তি স্থাপন করেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৫৯০ সালে মোগল সুবেদার মানসিংহ বঙ্গ বিজয়ের পর এই অঞ্চলে আসেন এবং বিষ্ণুদাসের আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে কয়েকটি গ্রাম দান করেন। সেই জমির ওপর গড়ে ওঠে হাজরাহাটি জমিদারি, যা পরবর্তীতে নলডাঙ্গা রাজ্যে পরিণত হয়।
পরবর্তী প্রায় তিন শতাব্দী ধরে বিভিন্ন শাসকের হাতে রাজবংশটি পরিচালিত হয়। উনিশ শতকের শেষভাগে রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায় রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেন। তিনি শিক্ষা বিস্তারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুল, যা আজও এলাকার অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
১৯৫৫ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে নলডাঙ্গা রাজবংশেরও অবসান ঘটে। এরপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে রাজ্যের অধিকাংশ স্থাপনা ও ঐতিহ্য। বর্তমানে অবশিষ্ট মন্দিরগুলোই বহন করছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাসের স্মৃতি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের উদ্যোগে নলডাঙ্গা রাজবাড়ী ও মন্দিরগুলোকে সংরক্ষণ, গবেষণা এবং পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন করা হলে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় স্থান পেতে পারে। অন্যথায় ইতিহাসের এই মূল্যবান অধ্যায়ও একদিন হারিয়ে যাবে সময়ের অতলে।



