চৌদ্দ বছর আগে, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত হয় ১৫ বছর বয়সী কিশোরী ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কাঁটাতারের বেড়ায় তার লাশ দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার হৃদয়বিদারক ছবি সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ঘটনাটি শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই নাড়া দেয়নি, বিশ্ব বিবেককেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এত বছর পরও সেই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বিচার সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও বিজিবির বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে ফেলানী হত্যার পর থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে মোট এক হাজার ১৪৯ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ছয়জন বাংলাদেশী সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন। বছরের শুরুতে তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও এপ্রিল ও মে মাসে একাধিক হত্যাকাণ্ড নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মো: মুরসালিন (২০) ও নবীর হোসেন (৫০) নিহত হন। এর আগে ৮ এপ্রিল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে আলী হোসেন (৩৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। জানুয়ারিতেও বিভিন্ন সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্লেষণে যেসব কারণ উঠে আসছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে সহিংসতার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত— প্রায় চার হাজার ১৫৬ কিলোমিটার। এর বড় অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল। দারিদ্র্য, চোরাচালান, গরু ও মাদক পাচার এবং অবৈধ পারাপারের প্রবণতা সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এসব নিয়ন্ত্রণে গিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে বলে সমালোচকদের মত। বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতিতে কার্যকর পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে দাবি করা হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে আইনের আওতায় আনার বদলে গুলি করার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি-এমন অভিযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বহুল আলোচিত ফেলানী হত্যার ঘটনায় প্রথমে অভিযুক্ত সদস্যকে খালাস দেয়া হয়; পরে পুনর্বিচার হলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সীমান্তে পুনরাবৃত্ত হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য
গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। তার মতে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে; প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, এমনকি জাতিসঙ্ঘের দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, বহু ঘটনারই এখনো বিচার হয়নি, যা দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মত
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) আশরাফুজ্জামান খান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তেও এ ধরনের ধারাবাহিক প্রাণহানি দেখা যায় না। তার মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক কূটনৈতিক দৃঢ়তা এবং জাতীয় স্বার্থে কঠোর অবস্থান নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, নীতিগত পরিবর্তন ও জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে হত্যাকাণ্ড কমতে পারে। একই সাথে সীমান্ত এলাকায় বিকল্প অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে চোরাচালাননির্ভরতা কমে।
সামনে করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বৈঠক বা বিবৃতি যথেষ্ট নয়। কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন-
সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতি পুনর্বিবেচনা।
যৌথ টহল ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার।
সীমান্ত এলাকায় কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি।
ফেলানীসহ সব আলোচিত ঘটনার স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা।
ফেলানী এখন শুধু একটি নাম নয়; তিনি সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরো স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক করতে হলে সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধ করাই সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বন্ধুত্বের ভাষণ যতই উচ্চকিত হোক, সীমান্তে রক্তপাত অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস ও ক্ষোভের দেয়াল আরো উঁচু হবে।



