পৌনে ২ কোটি প্রান্তিক গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের মূল্য অপরিবর্তিত

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম

দেশের প্রায় পৌনে দুই কোটি প্রান্তিক ও নি¤œ আয়ের বিদ্যুৎগ্রাহকের জন্য বড় স্বস্তির খবর এসেছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার মাত্র একদিন পরই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আবাসিক লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার স্থগিত করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে গতকাল প্রান্তিক ও নি¤œ আয়ের গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমাতে বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নেয়।

বিইআরসির সংশোধিত আদেশ অনুযায়ী, আবাসিক লাইফলাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের যে মূল্যবৃদ্ধি ৩ জুন ঘোষণা করা হয়েছিল, তা কার্যকর হবে না। ফলে লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সাই বহাল থাকবে। এর আগে ৩ জুন বিইআরসি গণশুনানির ভিত্তিতে বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্যহার ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা করা হয়েছিল। একইভাবে প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এতে লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ৯২ পয়সা মূল্য বৃদ্ধি পেত। তবে নতুন ট্যারিফ ঘোষণার পরপরই বিদ্যুৎ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিভাগটির মতে, লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) যে বিশেষ মূল্যহারের প্রস্তাব দিয়েছিল, তা নতুন ট্যারিফে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে নি¤œবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য নতুন মূল্যহার পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সহনীয় বিদ্যুৎমূল্য বজায় রাখা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে লাইফলাইন গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১। অর্থাৎ দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গ্রাহকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং ভ্যাট যোগ হওয়ায় একজন লাইফলাইন গ্রাহকের মাসিক বিল প্রায় ৩৭ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারত। অনেকের কাছে এই অঙ্ক ছোট মনে হলেও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত ব্যয়। বিশেষ করে বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই বাড়তি চাপ তাদের জন্য আরো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠত।

বিইআরসি জানিয়েছে, লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর না করায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর আয় কিছুটা কমবে। তবে এই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করতে হবে। কমিশনের মতে, জনস্বার্থ এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

সংশোধিত আদেশ অনুযায়ী, জুন ২০২৬ বিলিং মাস থেকে লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা কার্যকর থাকবে। ফলে ৩ জুন ঘোষিত খুচরা বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে আসবে। যদিও প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবুও অন্যান্য গ্রাহকশ্রেণীর জন্য নতুন ট্যারিফ বহাল থাকবে। এর আগে বিইআরসি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করে, যা প্রায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সাথে সামগ্রিক খুচরা ট্যারিফেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি আনা হয়।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। বিইআরসির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সেই ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।