ভোলায় ১৩ কোটি টাকার মৎস্য অবতরণকেন্দ্র অচল

Printed Edition

মাকসুদুর রহমান পারভেজ লালমোহন (ভোলা)

ভোলায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দু’টি সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র চালুর আগেই নানা ত্রুটি ও অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত এসব স্থাপনা এখন ব্যবহারবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, পরিকল্পনার দুর্বলতা, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এত বড় একটি প্রকল্প জেলেদের কোনো কাজেই আসছে না।

মৎস্য অধিদফতরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের আওতায় ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়ার কাঠিরমাথা এবং লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় দু’টি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ, বিপণন সুবিধা বৃদ্ধি এবং জেলেদের জন্য আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেলেও কেন্দ্র দু’টিতে এখনো কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে বুড়িরদোন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভবনটির চারপাশে কোনো জনসমাগম নেই। প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। খালের দিকে মুখ করে নির্মিত অবতরণকেন্দ্রটির সামনে পর্যাপ্ত নৌযান চলাচলের সুবিধাও নেই। স্থানীয় জেলেদের দাবি, এখানে নিয়মিত অল্পসংখ্যক নৌকা মাছ বিক্রি করতে আসে। বেশির ভাগ সামুদ্রিক মাছ ধরার ট্রলার অন্য ঘাটে ভিড়ে এবং মাছ খালাস করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং টাইলস ভেঙে যাচ্ছে। সিঁড়ির পিলার, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোও নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

জেলে মিজান মাঝি বলেন, চালুর আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। ভালো মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি এ প্রকল্পে। স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, প্রকল্পে বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ, জেনারেটর, পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংযোগসড়ক থাকার কথা থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। বুড়িরদোন কেন্দ্র থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সংযোগপথও নির্মিত হয়নি। ফলে জোয়ারের সময় যাতায়াতে ভোগান্তি তৈরি হয়।

অন্য দিকে ভোলা সদরের কাঠিরমাথা কেন্দ্রের সামনে নদীতে চর জেগে ওঠায় বড় ট্রলার ভিড়তে পারে না। এতে মাছ খালাস ও বেচাকেনার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

বুড়িরদোন মাছঘাটের আড়তদার মো: শাহাদাত হোসেন বলেন, এ কেন্দ্রের সুবিধাভোগী কারা, সেটাই এখনো পরিষ্কার নয়। নির্মাণের সময় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে অনেককে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্পের ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে কাজ করতে হয়েছে। যেসব যন্ত্রপাতি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেগুলোর সবই সরবরাহ করা হয়েছে।

কাঠিরমাথা মাছঘাটের সভাপতি ও ইউপি সদস্য মো: মনির হোসেন বলেন, চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ঠিকাদারের কিছু মালামাল আটকে রাখা হয়েছে। শর্ত পূরণ হলে সেগুলো ফেরত দেয়া হবে।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: ইকবাল হোসাইন বলেন, প্রকল্পটি কেন্দ্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জেলা কার্যালয় নকশা, ব্যয় কিংবা নির্মাণমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানে না। পাঁচ সদস্যের একটি কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্র দু’টি সম্প্রতি হস্তান্তর করা হয়েছে। কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে।

মৎস্য বিভাগের প্রকৌশলী গৌতম চন্দ্র দে অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, প্রকল্পটি সংশোধিত নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাজেট সংকোচনের কারণে প্রাথমিক পরিকল্পনার কিছু অংশ বাদ দিতে হয়েছে। তার দাবি, মাছ অবতরণ, বাছাই, প্যাকেজিং ও লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সেখানে রয়েছে।

প্রকল্পের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, স্থান নির্বাচন ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় যাচাই-বাছাই করেই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ করা হয়েছে। এখন স্থানীয় অংশীজনদের সহযোগিতায় কেন্দ্রগুলো চালু করা সম্ভব।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, জেলেদের উন্নয়নের কথা বলে নির্মিত কোটি টাকার এসব অবকাঠামো যদি ব্যবহারই না করা যায়, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে? চালুর আগেই নানা অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে এই অবতরণকেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন সংশয় দেখা দিয়েছে।