শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার রায় রোববার

ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় রায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় আগামী ৭ জুন (রোববার) ঘোষণা করা হবে। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হতে যাচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ের এই দিন ধার্য করেন। এর আগে গত ১৯ মে পল্লবীতে ওই নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটেছিল।

গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক এজলাসে বসার পর মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়, যা চলে বেলা ১টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত। সকাল ৯টার দিকেই কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে (৩২) আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। পরে বেলা ১১টা ২৪ মিনিটে তাকে কাঠগড়ায় হাজির করে পুলিশ। অন্য দিকে, অসুস্থ থাকায় হাসপাতাল থেকে বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে আদালতে আনা হয় অপর আসামি ও সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি : শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু প্রধান আসামি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। একই সাথে স্বামীর অপরাধে সহযোগিতা করা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রাখায় স্বপ্নারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।

আদালতে নিহত শিশুর বাবা-মায়ের সাক্ষ্য এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কনস্টেবলের বক্তব্য পড়ে শুনিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, “একই ফ্লোরে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগী শিশু ও আসামিরা বসবাস করত। ওই ফ্লোরে অন্য কোনো পরিবার ছিল না। ঘটনার দিন শিশুটিকে ফুসলিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করে সোহেল। এ ঘটনায় ১৬ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।”

আইনজীবী আরো উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় স্বপ্নার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সন্দেহজনক। তিনি ভেতর থেকে ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন। আশপাশের লোকজন দরজা খুলতে বললে তিনি ভেতর থেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বলেন যে, সেখানে কোনো শিশু নেই। এ ছাড়া ঘটনার পরপরই প্রত্যক্ষদর্শী আবু শামা নামের একজন আসামি সোহেলকে ভবনের তিনতলার জানালা দিয়ে নিচে নামতে দেখেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, সোহেল রানা শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যার পর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।

‘ডলার’ তত্ত্ব ও নেশাগ্রস্ততার অজুহাত : আসামি সোহেল রানা এর আগে ১ ও ২ জুন আদালতে দাবি করেছিলেন যে ‘ডলার’ নামে মিরপুরের এক ধনী ব্যক্তিও এই অপরাধের সাথে জড়িত। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গতকাল আদালতে সোহেল রানার আগের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী উপস্থাপন করে বলেন, সেখানে ‘ডলার’ নামের কারো কোনো উল্লেখ ছিল না। এটি মূলত বিচার ভিন্ন খাতে নেয়ার একটি অপচেষ্টা।

যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসামির জবানবন্দীর বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, গ্রেফতারের পর সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তার জবানবন্দী রেকর্ড করেন। জবানবন্দীতে সোহেল রানা বলেন, তিনি ওই বাসার তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকতেন এবং নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। ঘটনার দিন পাশের বাসার আট বছরের শিশু রামিসাকে বাসার বাইরে দেখতে পেয়ে ডেকে নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে জোর করে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় রামিসা চিৎকার শুরু করলে তার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখে ওড়না বেঁধে ধর্ষণ করেন। জবানবন্দীতে আরো বলা হয়, ধর্ষণের পর শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে মৃত মনে করেন সোহেল। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে কক্ষ থেকে একটি ছুরি এনে শিশুটির মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। হাতও বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন। এ সময় শিশুটির মা তাকে খুঁজতে খুঁজতে ঘটনাস্থলের বাইরে এসে ডাকাডাকি শুরু করেন। এতে ভয় পেয়ে সোহেল রানা একটি রেঞ্জ দিয়ে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান বলে জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে বেলা ১টা ৩১ মিনিটে আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, আসামি তার জবানবন্দীতে নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির জবানবন্দী কখনো শতভাগ সঠিক হতে পারে না, তাই এর ওপর ভিত্তি করে শাস্তি দেয়া সমীচীন নয়। এর জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, অপরাধ সংঘটন ও আদালতে জবানবন্দী দেয়ার সময় আসামি কোনোভাবেই নেশাগ্রস্ত ছিলেন না।

এমনকি আসামিপক্ষে সরকার নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহও স্বীকার করেন যে, আসামিরা ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে ‘ডলার’ সম্পর্কে কিছুই বলেনি এবং পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনেও এই নামের কোনো অস্তিত্ব নেই।

মামলার প্রেক্ষাপট : গত ১৯ মে মিরপুরের পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে ওই শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই ফ্ল্যাটের বাথরুমের গ্রিল কেটে প্রধান আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও পুলিশ তার স্ত্রী স্বপ্নাকে তখনই আটক করে। ওই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয় সোহেলকে। পরদিন ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দেন সোহেল রানা। এরপর দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে গত ১ জুন এই দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগ গঠন) দাখিল করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।