রয়টার্স
ইরানের সাথে যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তির দিকে এগোলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সঙ্ঘাতের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিণতি হতে পারে ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সাথে সম্পর্কের ক্রমাবনতি। জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, ইউরোপের অন্যত্র সেনাসংখ্যা কমানোর হুমকি এবং গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় মিত্রের ওপর ইরানের হামলাকে তুচ্ছ করে দেখা- প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১০ সপ্তাহের এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে ফাটল ধরেছে, তা সহজে মেরামত হওয়ার নয়।
মার্কিন সেনারা জার্মানিতে থাকার বিষয়ে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলে আসছেন। এবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন যে, ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে লজ্জায় ফেলছে- এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প জার্মানিতে মোতায়েন ৩৬ হাজার ৪০০ সেনার মধ্য থেকে পাঁচ হাজার প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। একই সাথে জার্মানিতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়। ট্রাম্প আরো ইঙ্গিত দেন যে, ইতালি ও স্পেনেও সেনা কমানো হতে পারে।
উত্তেজনা আরো বেড়েছে যখন ট্রাম্প দাবি করেন মিত্ররা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহায়তা করছে না এবং ইঙ্গিত দেন এর ফলে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা ‘আর্টিকেল ৫’ মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নিয়েও তিনি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও তিনি উপহাস করেছেন এবং যুক্তরাজ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এমনকি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটেনের দাবির স্বীকৃতি পর্যালোচনার কথাও উঠেছে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের বেপরোয়া আচরণ বেশ কিছু নাটকীয় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন হুমকির মুখে।’
ইউরোপীয় দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে, যৌথভাবে অস্ত্রব্যবস্থা তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে এবং মার্কিন নির্ভরতা কমাতে সক্রিয় হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধের জন্য এখনো তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে এবং পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জনে বছরের পর বছর লাগবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলেও ক্ষোভ বাড়ছে। এ সপ্তাহে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়- যাতে ফুজাইরা তেল বন্দরে আগুন লাগে এবং স্কুল বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। তারপরও ট্রাম্প একে সামান্য ঘটনা বলে উড়িয়ে দেন এবং দাবি করেন যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে।
এশিয়ার মিত্ররাও উদ্বিগ্ন। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো তেল-নির্ভর দেশগুলো মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে। জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও প্রত্যাশা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে - এটি পুরো অঞ্চলের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।’
অন্য দিকে রাশিয়া উচ্চমূল্যের জ্বালানি থেকে সুবিধা নিচ্ছে, আর চীন নিজেকে আরো নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চীন ও রাশিয়াকে তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আরো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।



