অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের উন্নতিতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে খুশির আমেজ দেখা যায়, আবার সূচকের পতনে তাদের মুখ হয়ে ওঠে মলিন। কিন্তু গত দু’দিন তারই উল্টো চিত্র দেখা গেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল সূচকের অবনতি দিয়েই লেনদেন শেষ করে দেশের দুই পুঁজিবাজার। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল খুশির আমেজ। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের রেকর্ড পরিমাণ উন্নতি ঘটে, যা বাজারের মূল্যস্তরে বড় ধরনের উন্নতি ঘটায়। আর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগই করা হয় মুনাফার জন্য। গত দু’দিন এ কাজটিই করেছেন তারা। ফলে সূচকের পতনেও তারা ছিলেন খুশির আমেজে।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৮ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৫৮৯ দশমিক পাঁচ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৫৭০ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি হয় যথাক্রমে ৯ দশমিক ৫২ ও ১ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এ দিন ৯ দশমিক ৪২ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৬ দশমিক ০৮ ও ৮ দশমিক ১৮ পয়েন্ট।
সূচকের পতন ঘটলেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারে লেনদেনের খুব বেশি অবনতি ঘটেনি। এতে প্রমাণিত হয় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেয়ার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম মূল্যস্তরের কোম্পানিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল এক হাজার ২২২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৫ কোটি টাকা কম। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। তবে একই দিন লেনদেন বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসই গতকাল ২১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৮ কোটি টাকা বেশি। সোমবার বাজারটির লেনদেন ছিল ১৩ কোটি টাকা।
দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মঙ্গলবার ব্যাংকিং খাতেই সবচেয়ে বেশি মুনাফা তুলে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানি বিশেষ করে আগের দু’দিন মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোই গতকাল বেশি দর হারিয়েছে। এদের মধ্যে ছিল ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের বাইরেও বেশ কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে গতকাল কম বেশি সংশোধন ঘটে। আবার কোনো কোনোটির মূল্যবৃদ্ধির হার বেড়ে গেলে তা থেকে মুনাফা তুলে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এসিআই গ্রুপের দু’টি কোম্পানি এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে ছিল।
গতকাল মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলো ঘুরে দেখা যায়, বিনিয়াগকারীরা বেশ আমেজেই আছেন। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা নয়া দিগন্তকে জানান, দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজার আচরণ নিয়ে তারা বেশ সন্তুষ্ট। লেনদেনের শেষ দিকে এসে সূচকের পতন ঘটলেও তাদের মুখে হাসি ছিল। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, গত তিন দিন বাজার যে আচরণ করেছে তাতে তারা তাদের কাজটি ঠিকই করেছেন। আগের বিনিয়োগ থেকে তারা তাদের কাক্সিক্ষত মুনাফা তুলে নিতে পেরেছেন। তারা মনে করেন, এ আচরণ অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের পুঞ্জীভূত লোকসানের একটি অংশ তারা অবশ্যই ফিরে পাবেন এমনটিই প্রত্যাশা তাদের। তাই মুনাফা তুলে নেয়ার পাশাপাশি তারা নতুন করে বিনিয়োগে যাচ্ছেন।
এ দিকে, প্রেফারেন্স তথা অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার ছেড়ে নতুন করে ১৬১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করবে পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত সিমেন্ট খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি প্রিমিয়ার সিমেন্ট। গত সোমবার প্রিমিয়ার সিমেন্টকে প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহের এই অনুমোদন দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মঙ্গলবার প্রিমিয়ার সিমেন্টের পক্ষ থেকে বিএসইসির অনুমোদনের বিষয়টি দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, বাজার থেকে নতুন করে ১৬১ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে প্রিমিয়ার সিমেন্ট ৩২২টি প্রেফারেন্স শেয়ার ইসু করবে। প্রতিটি প্রেফারেন্স শেয়ারের অভিহিত মূল্য বা বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এই শেয়ার বিক্রি করা হবে। অরূপান্তরযোগ্য এই প্রেফারেন্স শেয়ারের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে আপাতত পাঁচ বছর।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, প্রেফারেন্স শেয়ার ছেড়ে বাজার থেকে সংগ্রহ করা অর্থে কোম্পানিটি উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ করবে। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তরে এই অর্থ খরচ করা হবে। এর ফলে কোম্পানির নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে। তাতে বাড়বে কোম্পানিটির তারল্য পরিস্থিতি তথা নগদ অর্থের জোগান, যা ব্যবসা বাড়াতে সহায়তা করবে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, গত বছরের জুনে প্রেফারেন্স শেয়ার ছাড়ার এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ জন্য বিএসইসির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। সোমবার এ বিষয়ে বিএসইসির অনুমোদন পাওয়া গেছে। এখন বিশেষ সাধারণ সভা বা ইজিএমে শেয়ারধারীদের অনুমোদনের পর এই শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট ২০১৩ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে এটি ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে ‘এ’ ক্যাটাগরিভুক্ত। সর্বশেষ গত জানুয়ারি শেষের তথ্য অনুযায়ী, শত কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটির শেয়ারের ৪২ শতাংশের বেশি মালিকানা রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। আর ৩১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। বাকি প্রায় ২৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রিমিয়ার সিমেন্ট প্রায় ১৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। ওই অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের ১০ শতাংশ করে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। ঘোষিত এই লভ্যাংশ বাবদ কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের মধ্যে বিতরণ করেছে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ গত অক্টোবর-ডিসেম্বর তথা চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে কোম্পানিটির মুনাফার পরিমাণ ছিল ৭৪ লাখ টাকা। তাতে শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস দাঁড়ায় ৭ পয়সায়।



