সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেছেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও বিচার বিভাগের জন্যে আলাদা সচিবালয় হওয়ার মানে হচ্ছে এই বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। জজ কিভাবে নিয়োগ হবে, বিচারপতি কিভাবে নিয়োগ হবে, বিচারক কিভাবে নিয়োগ হবে এটা সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে। এখন বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ অধ্যাদেশ যখন বাতিল করে দেয়া হলো; তার মানে বিচার বিভাগ আবার নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ হয়ে গেল।
তিনি বলেন, নিম্ন আদালত বলেন আর উচ্চ আদালত বলেন সর্বত্র রাজত্ব করবে নির্বাহী বিভাগ। অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগকে বুঝাতে চায় আমরা তোমাদের নিয়োগকর্তা। এর মানেই হচ্ছে বাংলাদেশ একটা ছোট দেশ, একটা চাকরি বলেন, দিন শেষে তার পরিবার ও জীবিকা নির্বাহ কেউ এটা হারাতে চায় না। নির্বাহী বিভাগ যেখান থেকে হেঁটে যাবে তার সাথে যদি বিচারকরা থাকে, তাদের মাথার মধ্যে সাইকোলজিক্যাল প্রভাব হবে ওনারা আমাদের নিয়োগকর্তা। ব্যক্তিগত পর্যায়ের মামলার কথা বলছি না, সরকার যে মামলায় ইন্টারেস্ট নেবে সেই মামলায় সরকারের পক্ষেই ফলাফল আসবে মোটামুটি নিশ্চিত। সরকার যেসব মামলা করছে, রাজনীতিক বলেন কিংবা পলিসিগত মামলা কখনো কি দেখেছেন বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো মামলায় পরাজিত হয়েছে তারা।
নয়া দিগন্ত : নিয়োগ কর্তা যেই হোক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন থেকে যায়।
আবু হেনা রাজ্জাকী : সরকারের বিরুদ্ধে পলিসিগত যত মামলা, রিট যাই হোক না কেন সরকারের বিরুদ্ধে যেগুলো হয়েছে, সেগুলো ডিসমিস ছাড়া অন্য কোনো রেজাল্ট পায়নি। নির্বাহী বিভাগের অধীনে বিচার বিভাগ রাখার মানেই হলো তাদের নলেজে দেয়া যে, আমরা তোমাদের নিয়োগকর্তা। আর নিয়োগকর্তাকে সবাই কেয়ার করবে এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাংলাদেশ, এটাই বাংলাদেশের ইতিহাস।
নয়া দিগন্ত : এটাকে তো আমরা অতিক্রম করতে চেয়েছিলাম।
আবু হেনা রাজ্জাকী : ওভারকাম করতে পারবেন না এই কারণে; যেহেতু টু থার্ড মেজরিটি পাওয়ার কারণে সমস্ত আইনের ঊর্ধ্বে তারা উঠে যায়।
নয়া দিগন্ত : বিরোধীদলগুলোর পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে।
আবু হেনা রাজ্জাকী : বিরোধিতা হলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো জোরালো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। জোরালো কোনো প্রতিবাদ করে নাই। কোনো আঁতাত করেছে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হচ্ছে না এ নিয়েও কোনো জোরালো ভূমিকা দেখি নাই। পার্লামেন্টের ভিতরে সাউটিং হবে, চিৎকার হবে জোরালো কণ্ঠে, কই আমরা তো সেই ভয়েস দেখি নাই। ওয়াক আউট করেছে সে তো ভিন্ন কথা। বিরোধীদলের কাছে আমরা তো আশাবাদী, তাদের কাছেই আমাদের প্রত্যাশা।
নয়া দিগন্ত : কেউ কেউ বলছে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ না হলে কিলার অব ডেমোক্রেসির শঙ্কা থেকে যায়।
আবু হেনা রাজ্জাকী : হ্যাঁ, এই একটা জায়গা যদি মানুষের থাকে, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হলে তা গণতন্ত্র ফিরে আসার সহায়ক, এটা নাগরিক অধিকার ফিরে আসার সহায়ক, সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য বিনষ্ট করার এটা একটা উপায় এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বপ্ন জাগে মানুষের। নির্বাহী বিভাগের অধীনে বিচার বিভাগ থাকলে মানুষের সেই জায়গাটা থাকবে না।
নয়া দিগন্ত : জোরালো প্রতিবাদ নেই কেন?
আবু হেনা রাজ্জাকী : বিরোধীদলের অভিজ্ঞতা কম। তাদের অ্যাড্রেসিংয়ে গোলমাল হতে পারে, কোন প্রক্রিয়ায় বলবে সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু সারমর্ম তো বলা যায় যে এটা গণতন্ত্র হত্যার শামিল। পার্লামেন্টে এই কথাটা কেন আসে নাই।
নয়া দিগন্ত : অতীতে পছন্দনীয় ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতির বয়স বাড়ানোর নজির রয়েছে।
আবু হেনা রাজ্জাকী : সবই তো ঘোলাটে থেকে গেল। সবচেয়ে বড় কথা; বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের অধীনেই থেকে গেল। কোনো জোরালো প্রতিবাদের যে প্রত্যাশা করেছিল মানুষ তা দেখা গেল না। দুই পক্ষই জনগণের জন্য তেমন কিছু করছে না, বিরোধীদলের বলিষ্ঠ চেষ্টা দেখতে চাই।



