অনলাইন জুয়ার ছোবলে প্রান্তিক জনপদ

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • লোভনীয় বিজ্ঞাপনে অল্প সময়ে ধনী হওয়ার ফাঁদে দিচ্ছেন পা
  • হচ্ছেন সর্বস্বান্ত, ঘটছে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও
  • মহামারী রূপ নিলেও নেই আইনি পদক্ষেপ

২০ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী (ভূজারীপাড়া) গ্রামের অনলাইন জুয়ায় আসক্তি ও ক্রমাগত টাকা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন নাহিদ রানা (২০)। তার পরিবার জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিলেন নাহিদ। জুয়ার কারণে বারবার অর্থ হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ১৮ এপ্রিল প্রায় ১০ হাজার টাকা হারানোর পর তিনি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এক দিন পর সকালে বিষপান করে পরিবারের সদস্যদের জানালে স্বজনরা তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথেই মৃত্যু হয়।

এর আগে ১৫ এপ্রিল জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় অনলাইন জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে জাহিদুল ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবক প্রকাশ্যে দুধ দিয়ে গোসল করে জুয়া ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, জাহিদুল ইসলাম নিজের গায়ে দুধ ঢালছেন। এ সময় তিনি বলেন, জুয়া খেলতে গিয়ে তার সংসার ও আর্থিক সচ্ছলতা নষ্ট হয়ে গেছে।

কুমিল্লা শহরের এক মুদিদোকানের কর্মচারী বলেন, আমি দোকান থেকে প্রতিদিন রাতে বাড়ি গিয়ে জুয়া খেলি। এটি এমন এক নেশা যারা খেলে তারাই বুঝতে পারে। জুয়া খেলে আমার জমানো প্রায় ৭০ হাজার টাকা খুইয়েছি। দোকানের মালিক কাজ থেকে বাদ দিয়েছিল। আর খেলব না বলে হাতে পায়ে ধরে আবার কাজে মনোযোগ দিয়েছি।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া বর্তমানে শহর ছাড়িয়ে প্রান্তিক জনপদ বা প্রত্যন্ত গ্রামে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে এই সর্বনাশা নেশা তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষকেও নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এটি নীরব মহামারী হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অনলাইন জুয়ায় ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চা দোকানি, সেলুনকর্মী, হকার, বাড়ির নিরাপত্তাপ্রহরী, বিক্রয়কর্মী, ভবঘুরে, বাস-ট্রাকচালক, সিএনজি চালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, রিকশাচালক ও দিনমজুরসহ অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং বিভিন্ন ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার সাইটে ‘বাবু ৮৮’, ‘ওয়ানএক্সবেট’, ‘বাজি লাইভ’সহ বিভিন্ন অ্যাপের বিজ্ঞাপনে নানা প্রলোভনে ছড়ানো হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপনে ‘সহজে ধনী হওয়ার’ বা ‘ক্লিক করলেই আয়’ এমন প্রলোভন দেখানো হয়। পরে জড়িয়ে পড়ে এসব জুয়ায়। শুরুতে কিছু আয় করতে পারলেও দিন শেষে সর্বস্বান্ত হতে হয়। তা ছাড়া গ্রামের স্থানীয় প্রভাবশালী বা প্রযুক্তিতে দক্ষ কিছু ব্যক্তি অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। তারা সাধারণ মানুষকে জুয়ায় প্রলুব্ধ করে এবং তাদের মাধ্যমে কমিশনের বিনিময়ে জুয়াড়িদের অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। তারা বেশি লাভের আশায় ছোট অঙ্কের বিনিয়োগ করলেও পরে পুরো অর্থ হারাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামের রিকশাচালক, কৃষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ প্রায় সবার হাতেই এখন স্মার্টফোন। ইন্টারনেটের প্রসারে ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইটগুলোতে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে জুয়ার এজেন্টরা খুব সহজেই গ্রাম পর্যায়ে টাকা লেনদেনের ব্যবস্থা করছে। অ্যাপগুলোতে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা ডিপোজিট করেই জুয়া শুরু করা যায়। উচ্চ বেকারত্বের কারণে গ্রামের যুবকরা দ্রুত টাকা উপার্জনের শর্টকাট উপায় হিসেবে এই জুয়াকে বেছে নিচ্ছে, যা পরে আসক্তিতে পরিণত হয়। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই ও স্থানীয় অপরাধ বাড়ছে।

মনোরোগ চিকিৎসকরা বলছেন, অনলাইন জুয়া আসক্তির একটি ভয়ঙ্কর রূপ। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মানসিক চাপ, বিষণœতা ও আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ায়। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি ব্যাপক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটাতে কেবল একা নয়; প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার গত কয়েক বছরে তিন হাজার ৫০০টিরও বেশি জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে। সিআইডি, ডিবি ও র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে জুয়ার সাইট পরিচালনাকারী শতাধিক ব্যক্তি। তবে প্রতিটি সাইট বন্ধ করার পরপর এই চক্র ভিপিএন (ভয়েস ওভার প্রটোকল নেটওয়ার্ক) দিয়ে সাইটগুলো আবার সচল করে। যদিও বাংলাদেশে ১৮৬৭ সালের আইন এবং ২০২৫ সালের সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হয়। তারপরও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অপরাধ প্রতিরোধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার আসক্তি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া প্রতি ১০ জন ইন্টারনেট জুয়াড়ির মধ্যে একজন আসক্ত হয়ে পড়ছেন। প্রতি মাসে গড়ে একজন অনলাইন জুয়াড়ি পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেটিং টিপস পেজের সংখ্যা ৫০০টির বেশি, যেগুলো তরুণদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করছে জুয়ায় নামতে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন অনলাইন জুয়া ও বেটিং সাইটের সাথে সরাসরি জড়িত। ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় দুই কোটির বেশি পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২০ সালের চেয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজার বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপ বন্ধে কার্যকর আইনি উদ্যোগ না থাকায় আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছেন লাখ লাখ তরুণ-তরুণী। অনলাইন জুয়ায় এ দেশ থেকে বছরে পাচার হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের বিরুদ্ধে সারা দেশে জোরদার অভিযান চলছে। এসব এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বেটিং অ্যাপে জুয়ার ফাঁদ যে শুধু শহরকেন্দ্রিক তা নয়, শহর ছাপিয়ে তা এখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। অতি লোভে পড়ে জুয়ার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। অনলাইন জুয়ার কারণে দেশের বাইরে অর্থপাচারের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে বড় একটি ড্রাইভ দেয়া হবে।

সিআইডির সূত্রে জানা যায়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওয়ানএক্সবেট, মেলবেট, বেটউইনার নামের বেটিং সাইটগুলোতে বাংলাদেশের অনেক গ্রাহক বেটিং বা জুয়া খেলায় অংশ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে মূলত এসব অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিভিন্ন দেশে স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য দক্ষ ম্যানেজার নিয়োগ করা হয়। এদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জুয়ায় আসক্ত হয়ে মানুষ নিজের, পরিবারের ও সম্পর্কের দায়িত্ব ভুলে যায়। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনাতেও অবহেলা শুরু করে। ডিজিটাল জুয়ার বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেপথ্যের নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংস করা এবং কঠোর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বরং এটি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, অনলাইন জুয়া প্রথমে ছোট অঙ্কের টাকা দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বড় অঙ্কে পরিণত হয়। জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি থাকে যে খেলোয়াড় মাঝে মধ্যে জেতে, ফলে সে মনে করে আবার খেললে আরো লাভ হবে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদের কারণে মানুষ বারবার টাকা বিনিয়োগ করে এবং শেষ পর্যন্ত বড় অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন বিজ্ঞাপনে ‘সহজে টাকা আয়’ বা ‘কম সময়ে লাভ’ এর মতো প্রলোভন দেখানো হয়, যা মানুষকে আকৃষ্ট করে। তিনি আরো বলেন, অবৈধ অনলাইন জুয়া সাইটগুলো বন্ধ করা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ করা জরুরি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনলাইন জুয়া একটি প্রতারণামূলক ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। দ্রুত ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক প্রভাব মানুষকে জুয়ার দিকে টানে। বিজ্ঞাপন ও সোস্যাল মিডিয়ার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জুয়াকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়।