পবিত্র মাহে রমজান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য একটি বিশেষ উপহার। মাহে রমজান নিজেকে গুনাহমুক্ত করার অন্যতম সুযোগ। ফলে মুমিনদের এ মাসকে যথাযথ মর্যাদা দেয়া এবং নির্দিষ্ট আমলগুলো পালন করা অপরিহার্য। এ মাসকে সঠিক ও যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন মহানবী সা: এবং তার প্রিয় সাহাবীগণ।
চাঁদ দেখা : রমজানের ২৯ তারিখ চাঁদ দেখা সুন্নাত। কারো মতে ফরযে কিফায়া। রাসূল সা:-এর ব্যক্তিগত আমলের কারণে প্রত্যেক মুমিনের জন্য চাঁদ অনুসন্ধান করা মুস্তাহাব। মহানবী সা: বলেছেন- তোমরা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তবে তোমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ করো। (মুসলিম : ১০৮১, বুখারি : ১৯০৯) রাসূল সা: অন্যত্র বলেছেন- তোমরা নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা রেখো না এবং নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত রোজা ছেড়ে দিও না। (মুয়াত্তা হাদিস নম্বর ৬৩৫) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন, লোকের রমজানের চাঁদ অনুসন্ধান করছিল, আমি রাসূলুল্লাহ সা: কে জানালাম, আমি চাঁদ দেখেছি। তিনি আমার কথা বিশ^াস করে রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সুনানে আবি দাউদ ২৩৪২) মহানবী সা: নতুন চাঁদ দেখলে এ দোয়া পড়তেন- হে আল্লাহ! এ চাঁদকে আমাদের মধ্যে নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সাথে উদিত করান। আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। (তিরমিজি ৩৫২৬)
সাহরি গ্রহণ : সিয়াম পালন করার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে পানাহার করাকে সাহরি বলা হয়। সাহরি গ্রহণ করা সুন্নাত। মহানবী সা: বলেছেন- তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে রয়েছে বরকত (বুখারি : ১৯২৩) তিনি আরো বলেন- আমাদের রোজা আর আহলে কিতাবের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া। আমরা সাহরি খাই, তারা সাহরি খায় না। (মুসলিম, আল ফিয়াতুল হাদিস, পৃষ্ঠা-১৩১) সাহরি বিলম্বে খাওয়া সুন্নাত। আবু সাঈদ খুদরী রা: বর্ণনা করেন, মহানবী সা: বলেছেন- তোমরা সাহরি খাও, যদি তা এক ঢোঁক পানিও হয়। অন্যত্র বলেছেন- তোমরা সাহরি খাও, যদি তা এক লোকমা খাদ্যও হয়। এক ঢোঁক পানি, এক লোকমা খাদ্য, এক কাপ দুধ, সামান্য ফলমূল বা একটি খেজুরের মতো যৎসামান্য হলেও সাহরির সুন্নাতপূর্ণ হবে।
ইফতার : ইফতার অর্থ ভঙ্গ করা। সারা দিন উপবাস থাকার পর সূর্যাস্তের পর প্রথম যে পানাহারের মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ করা হয় তাকে ইফতার বলা হয়। যথাসময়ে ইফতার করা সুন্নাত। মহানবী সা: বলেছেন- রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ। একটি হলো ইফতারের সময়, অপরটি হলো আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময় (মুসলিম, তিরমিযী-৭৬৬) মহানবী সা: আরো বলেন- যখন রাত চলে আসে এবং দিন চলে যায় তখন রোজাদার রোজা খুলে ফেলবে (বুখারি : ১৯৫৪) রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেন- যতদিন লোকেরা দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন দ্বীন স্পষ্ট ও বিজয়ী থাকবে, কেননা, ইহুদী ও খ্রিষ্টানরা বিলম্বে ইফতার করে। (আবু দাউদ : ২৩৫০) মহানবী সা: ইফতারের সময় এলে দোয়া করতেন- হে আল্লাহ! আপনার জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার রিজিক দিয়ে ইফতার করেছি। (আবু দাউদ : ২৩৫৮) ইফতার শেষে দোয়া করা সুন্নাত। মহানবী সা: বলেন- যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য রোজাদারের প্রতিদান সমান প্রতিদান দেয়া হবে এবং রোজাদারের প্রতিদান থেকে কোনো প্রতিদান কমানো হবে না। (তিরমিজি : ৮০৭)। খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নাত।
তারাবিহর নামাজ : তারাবিহ্ তারবিহাতুন-এর বহুবচন। এর অর্থ আরাম নেয়া, বিশ্রাম করা। তারাবিহ্র নামাজের প্রতি চার রাকাআত অন্তর কিছুক্ষণ বসে দোয়া করা হয় এবং বিশ্রাম নেয়া হয় বিধায় এ নামাজকে সালাতু তারাবিহ্ বলা হয়। রমজান মাসের এশার নামাজের ফরজ ও সুন্নাত আদায় করে এবং বিতিরের নামাজের আগে তারাবিহ্র নামাজ পড়া হয়। রাসূলুল্লাহ সা: তারাবিহ্র নামাজ আদায় করতেন। আবার মাঝে মধ্যে এ নামাজ পড়া থেকে বিরতও থাকতেন। এর কারণ তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন, আর উম্মাতের কষ্টের কথা চিন্তা করে এ নামাজ আদায়ের অপরিহার্যতা থেকে তাদেরকে মুক্ত করা। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘আমার ভয় হয় যে, আমার উম্মাতের উপর এ নামাজ ওয়াজিব হয়ে যায় কি না। কেননা রাসূলুল্লাহ সা: নিয়মিত যে কাজ করতেন তা উম্মাতের উপর ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। তারাবিহ্র নামাজ ওয়াজিব হয়ে গেলে মানুষ তা নিয়মিতভাবে আদায় করতে সক্ষম হবে না এ আশষ্কা করেই তিনি মাঝে মধ্যে তারাবিহ্ পড়া থেকে বিরত থাকতেন। হাদিস শরিফে রয়েছে সর্বপ্রথম যখন রাসূল সা: তারাবিহ্র নামাজ পড়লেন তখন তার সাথে সাহাবায়ে কিরাম অংশগ্রহণ করেন। পরের দিনও আরো বেশি লোকজন জামাতের সাথে তারাবিহ্র নামাজ আদায় করেছেন। তৃতীয় দিনও প্রচুর লোক সমাগম হয়। আর চতুর্থ দিন মসজিদ ভর্তি হয়ে লোকজন জামাতের সাথে তারাবিহ্ পড়ার জন্য সবাই রাসূলুল্লাহ সা: এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু তিনি ঘরেই নামাজ আদায় করেছেন। অনেক প্রতীক্ষার পর সাহাবায়ে কিরাম এসে নামাজ আদায় করে নেন। পরদিন ফজরের নামাজ শেষে রাসূলুল্লাহ সা: নিজেই সবার উদ্দেশ্যে বলেন যে, গত রাতে তোমরা আমার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে বসেছিলে। আমি তোমাদের উপস্থিতি এবং অপেক্ষা করা সবই জানতাম, তবুও মসজিদে আসিনি। কেননা মসজিদে এলে আমাকে অবশ্যই তারাবিহ পড়তে হতো। আমি ভয় করি যে, এই ইবাদত আমি নিয়মিত করলে আমার উম্মাতের উপর তা ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আমি এ থেকে মাঝে মধ্যে বিরত থাকি। অবশ্য সাহাবায়ে কিরাম নিয়মিত তারাবিহ্র নামাজ আদায় করতেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে বিশেষত হজরত উমর রা: এর খিলাফতকালে তারাবিহ্র নামাজ জামাতের সাথে করার বিধান রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করা হয়।
লাইলাতুল কদর পালিত : করদ অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহত্ত্ব, মহিমান্বিত ইত্যাদি। লাইলাতুল কদর মানে মহিমান্বিত রজনী। অধিকাংশ মুফাস্সির এ ব্যাপারে একমত যে, এখানে কুরআন নাজিলের রাতটি সেই সূরা কদ্র-এ বর্ণিত কদরেরই রাত। কদরের বর্ণনা অনুযায়ী শব-ই-কদ্রের বৈশিষ্ট্য হলো : ১. এ রাতে কুরআন নাজিল হয়; ২. এটি বরকতময় রজনী; ৩. এ রাতে সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার ফয়সালা নির্ধারণ করা হয়। মুফাসসিরদের বর্ণনা অনুযায়ী এ রাতে আল্লাহ্ তা‘আলা সাংবাৎসরিক ফয়সালার ফিরিস্তি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করেন। হাদিসেও এ রাতের বহু ফজিলত ও গুরুত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, যে ব্যক্তি শব-ই-কদর এর ঈমানসহ সাওয়াবের নিয়তে ইবাদতের জন্য দাঁড়াবে তার পেছনের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (বুখারি) অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তোমাদের কাছে এ মাস (রমজান) এসেছে। এ মাসের মধ্যে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগা লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না।’ (ইব্ন মাজাহ্, মিশকাত, আত-তারগীব)
অন্য এক হাদিসে হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত আছে, ‘শব-ই-কদ্রে হজরত জিবরাঈল আ: একদল ফেরেশতা নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। তারা সেসব লোকের জন্য দোয়া করতে থাকেন, যারা এ রাতে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আল্লাহ্র ইবাদতে মশগুল থাকে।” (রায়হাকী, তাফসিরে ইবন কাছীর)
ইতিকাফ : ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ কোনো স্থানে অবস্থান করা। শরিয়তের পরিভাষায় যেই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামা’আত সহকারে নিয়মিত আদায় করা হয় এমন মসজিদে আল্লাহ্র ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়ত সহকারে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। হজরত রাসূলে আকরাম সা: স্বয়ং ইতিকাফ করেছেন এবং ইতিকাফ করার জন্য সাহাবাদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি বলেন : মসজিদ মুত্তাকিদের ঘর। যে ব্যক্তি ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করবে আল্লাহ্ তার প্রতি শান্তি ও রহমত নাযিল করবেন এবং পুলসিরাত পার-পূর্বক বেহেশতে পৌঁছাবার যিম্মাদার হবেন।
হানাফি মাজহাব মতে ইতিকাফ তিন প্রকার : ১. ওয়াজিব, ২. সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া এবং ৩. মুস্তাহাব বা নফল।
মানতের ইতিকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধা হলে আমি এতদিন ইতিকাফ করব- অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি এতদিন অবশ্যই ইতিকাফ করব। যতদিন শর্ত করা হবে ততদিন ইতিকাফ করা ওয়াজিব তথা বাধ্যতামূলক। ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। রোজা না রেখে কেবল ইতিকাফ করলে মানতের ইতিকাফ তথা ওয়াজিব ইতিকাফ সহিহ হবে না। দ্বিতীয়ত রমজান মাসের শেষ দশ দিন অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদা কিফায়া। গ্রাম কিংবা মহল্লাবাসীর পক্ষে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি এই ইতিকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় গ্রাম কিংবা মহল্লাবাসী সবাই সুন্নাতে মুআক্কাদা তরককারী হিসেবে পরিগণিত হবে।
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এর চিরাচরিত অভ্যাস ছিল রমজানের সারা মাসই ই’তিকাফ করা। কিন্তু ইনতিকালের বছর তিনি ২০ দিন ই’তিকাফ করেন। তবে চিরাচরিত অভ্যাস ছিল শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করার বিধান উলামায়ে কিরামের মতে শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করাই সুন্নাতে মুআক্কাদা।
ঈদ পালন : ঈদ আরবি শব্দ। এর অর্থ- দু’টি। একটি আনন্দ, অপরটি ফিরে আসা। এ দিনটি আনন্দ ও খুশির দিন বলে একে ঈদ বলা হয়। আবার এ দিনটি বারবার ফিরে আসে বলে একে বলা হয় ঈদ। আল্লাহ তা’য়ালা প্রতিবছর এদিনে স্বীয় বান্দাদেরকে তার নিয়মত ও অনুগ্রহ দ্বারা ধন্য করে থাকেন। এক মাস পানাহার নিষিদ্ধ থাকার পর আবার পানাহারের নির্দেশ প্রদান করা হয়। এতে রোজাদারের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হয়। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা: যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় যান তখন তিনি মদীনাবাসীর মধ্যে বিশেষ দু’টি দিবস প্রত্যক্ষ করেন। একটি হলো নওরোজ, অপরটি খোশরোজ। এ দিবসদ্বয়ে তারা খেলাধুলা ও আনন্দ-ফূর্তি করে। এতে রয়েছে মহানবী সা: এর অনেক সুন্নাত।
লেখক : প্রধান ফকিহ্, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী



