- প্রথম ধাপে ৩৭,৫৬৮ নারীপ্রধান পরিবার কার্ড পাবেন
- প্রতি মাসে পাবেন ২,৫০০ টাকা
- পরিবার নির্বাচনে কোনো দলীয়করণ হয়নি : অর্থমন্ত্রী
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সকাল দশটায় বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তিসংলগ্ন) এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পাইলট কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবার এ কার্ড পাবে। এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য হচ্ছে-নারীর মতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এ কার্ডের আওতায় প্রতি পরিবার মাসিক আড়াই হাজার টাকা পাবেন।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন। এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, একই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ তিতুমীর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, নারীর মতায়ন এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ল্েযই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিবারে নারীকে প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সুরা সুবিধা সহজে পৌঁছে দেয়া হবে।
পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ জন্য ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দফতরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা, শিা, বাসস্থান, ব্যবহৃত গৃহস্থালি সামগ্রী (টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল), রেমিট্যান্স প্রবাহসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। পরে এসব তথ্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হয়।
পাইলট পর্যায়ে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্য সূচক নির্ধারণ করে পরিবারগুলো হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
এর মধ্যে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নœ মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য যাচাইয়ের পর ৪৭ হাজার ৭৭৭টি সঠিক পাওয়া যায়। এরপর একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা নেয়া, সরকারি চাকরি বা পেনশনভোগী হওয়া ইত্যাদি বিবেচনায় চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্টের ভিত্তিতে সম্পন্ন হওয়ায় উপকারভোগী নির্বাচনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তেেপর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি নারীপ্রধান পরিবারকে একটি আধুনিক স্মার্ট কার্ড দেয়া হবে। স্পর্শবিহীন (কন্ট্যাক্টলেস) চিপযুক্ত এ কার্ডে কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
মন্ত্রী বলেন , প্রতিটি কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য সুবিধা পাবেন। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে সদস্যসংখ্যা পাঁচের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পান সেেেত্র সেই সব বিদ্যমান সুবিধা বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্য ভাতা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরো বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য উপকারভোগীরা পাইলটিং পর্যায়ে মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রাপ্ত হবেন এবং পরে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, পাইলটিং পর্যায়ে কোনো পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হতে বেতন-ভাতা, অনুদান, পেনশন পেয়ে থাকলে, নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক, কর্মচারী হিসেবে চাকরিরত থাকলে ওই পরিবার ভাতাপ্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না।
এছাড়া পাইলটিং পর্যায়ে কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন- গাড়ি, এসি) থাকলে বা পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে ওই পরিবার ভাতা প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হবে না- বলেও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ করা অর্থ থেকে ফ্যামিলি কার্ড ভাতা জি-টু-পি পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর পছন্দ অনুযায়ী তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
তথ্য সংগ্রহকালীন সময়ই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কোনো প্রকার বিলম্ব, ভুল অ্যাকাউন্টে জমা বা কোনো প্রকার হস্তপে ছাড়া উপকারভোগীরা ঘরে বসেই সরাসরি সরকার থেকে ভাতাপ্রাপ্ত হবেন।
মন্ত্রী বলেন, পাইলটিং পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের ল্েয জুন-২০২৬ সময়ের জন্য ৩৮ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা (৬৬.০৬ শতাংশ) সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান এবং ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা (৩৩.৯৪ শতাংশ) কর্মসূচি বাস্তবায়নের ল্েয তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম প্রণয়ন, কার্ড প্রস্তুতি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হবে।
তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে।
কার্ড বিতরণে কোনো দলীয়করণ নয়-অর্থমন্ত্রী
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের েেত্র কোনো ধরনের রাজনীতিকরণ বা দলীয়করণ করা হয়নি। স্বচ্ছ ও স্বাধীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের নির্বাচনে যে অঙ্গীকার ছিল, তার অংশ হিসেবে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি- বাংলাদেশের অর্থনীতির সুফল সব মানুষের ঘরে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা করা সহজ নয়। দেশের অর্থনৈতিক সমতা মাথায় রেখে বড় কোনো সামাজিক কর্মসূচি হাতে নেয়াও সহজ নয়।
আমির খসরু বলেন, প্রধান ল্য হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষদের আগে সহায়তা পৌঁছে দেয়া। আমরা দেখেছি, সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া মানুষ হচ্ছে হতদরিদ্র পরিবারগুলো। এসব পরিবারের গৃহস্থালি পরিচালনায় যে নারীপ্রধান ভূমিকা রাখেন, তাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে মতায়নের ল্েযই ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পটি বাংলাদেশের বাজেটের একটি বড় অংশের সাথে সম্পৃক্ত। তাই প্রকল্প পরিকল্পনার সময় থেকেই কিভাবে এ ব্যয় সামাল দেয়া যাবে, সে বিষয়েও বিস্তর কাজ করেছি। একই সাথে স্বচ্ছতার সাথে প্রকল্প বাস্তবায়ন কিভাবে করা যায়, সেটাও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, কারা এ সুবিধা পাবেন তা নির্ধারণের জন্য একটি স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনীতিকরণ বা দলীয়করণ করা হয়নি। স্বাধীনভাবে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রথম পর্যায়ে হতদরিদ্র ও নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোকে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। পরে ধাপে ধাপে দেশের সব নারীপ্রধান পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, এটা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী পদপে। আমরা যদি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার কথা বলি, যদি পিছিয়ে পড়া মানুষের কথা বলি, তাহলে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অনেক দিন ধরেই মানুষ এমন একটি কর্মসূচির প্রত্যাশা করছিল।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না বলেও দাবি করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছানোর েেত্র দুর্নীতি দেখা যায়। কিন্তু এ কার্ড ব্যবস্থায় সেই সুযোগ থাকবে না।
তিনি বলেন, এ কার্ডের মাধ্যমে নারীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে মতায়িত হবেন। তাদের জীবনযাত্রার মানেও পরিবর্তন আসবে। আড়াই হাজার টাকা একজন হতদরিদ্র পরিবারের জন্য দৈনন্দিন সংসার পরিচালনায় বড় সহায়তা।
তিনি আরো বলেন, আমি বিশ্বাস করি এ প্রকল্প শুধু স্বচ্ছতার সাথে নয়, অত্যন্ত দতার সাথেও বাস্তবায়িত হবে।



