নবজাতকদের দেহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় উদ্বেগ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

নবজাতকদের দেহে উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নতুন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি নবজাতকদের ৮১ শতাংশের শরীরে কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী ক্যাবসিয়েলা নিউমোনি (সিআর-কেপিএন) জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক একটি অগ্রাধিকার মারাত্মক জীবাণু হিসেবে চিহ্নিত। এই নবজাতকদের অর্ধেকেরও বেশি (৭০ শতাংশ) হাসপাতালে ৪৮ ঘণ্টার বেশি থাকার পর সিআর-কেপিএন দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। নবজাতকদের দেহে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষায় মোট ৪২৩ নবজাতকের ৩৪২টির মধ্যে পাওয়া গেছে। নবজাতক ছাড়াও আইসিইউকে চিকিৎসা নেয়া ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর দেহে কার্বাপেনেম প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরিয়াল (সিআরই) ছিল।

গবেষণাটি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কমিউনিকের ডিজিজ কন্ট্রোলের সহায়তায় আইসিডিডিআরবির অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স গবেষণা ইউনিট। অর্থায়ন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং দ্য টাস্কফোর্স ফর গ্লোবাল হেলথ। গবেষণার ইউনিটের প্রধান ছিলেন আইসিডিআিরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ড. ফাহমিদা চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার আইসিডিডিআরবিতে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এতে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক ডা: সায়েদুর রহমান।

বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও এ ধরনের গবেষণা এটাই প্রথম। স্থানীয় এলাকা ও হাসপাতাল উভয় েেত্রই মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বা কলোনাইজেশন পরীক্ষা করা হয়। কলোনাইজেশন হলে শরীরে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে কিন্তু তাৎণিক রোগের কারণ হয় না। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো পরবর্তীতে তার নিজের শরীর বা আশপাশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে রোগ সৃষ্টি করে রোগীকে দুর্বল করে ফেলে।

২০১৯ সালে শুরু হওয়া গবেষণাটির প্রথম পর্যায়ে সুস্থ ব্যক্তি এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পায়। লোকালয়ে থাকা ৭৮ শতাংশেরও বেশি সদস্যকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ পাওয়া গেলেও হাসপাতালের ৮২ শতাংশ রোগীর দেহে এক্সটেন্ডেড-স্পেকট্রাম সেফালোস্পোরিন-প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরিয়াল ছিল। হাসপাতালে ভর্তি ৩৭ শতাংশ এবং মানুষের বসতিতে ৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরিয়াল (সিআরই) পাওয়া যায়। এ ছাড়া কমিউনিটির ১১ শতাংশ এবং হাসপাতালের ৭ শতাংশ রোগীর মধ্যে কলিস্টিন-প্রতিরোধী এন্টারোব্যাকটেরিয়ালস পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের দেহে মেথিসিলিন-প্রতিরোধী স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস (এমআরএসএ) ছিল। এই গবেষণায় দুই হাজার ৬০০ টিরও বেশি ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা। এতে প্রমাণ হয়, একটি স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক অন্যটির বিরুদ্ধে কাজ না-ও করতে পারে।

গবেষণায় মা ও শিশুর মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি উপলব্ধি করার জন্য এক বছর পর্যন্ত গবেষণা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জীবনে প্রথম বছরের মধ্যেই সিআরই এবং প্রায় ৯০ শতাংশের মধ্যে ইএসসিআরইইর উপস্থিতি পাওয়া যায়। যেসব শিশু জন্মের পর ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় হাসপাতালে ছিল, এদের মধ্যে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ছিল। এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এই শিশুদের ৮০ শতাংশেরও বেশি অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিক তাদের শরীরের স্বাভাবিক জীবাণুর উপস্থিতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) ব্যবস্থা, যেমন স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে হাত ধোয়ার অভ্যাস জোরদার করা এবং পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা উন্নত করার মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা কলোনাইজেশন রক্তের ইনফেকশন উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। সেমিনারে তুলে ধরা এই ফলাফল প্রমাণ করে যে সীমিত-সম্পদযুক্ত হাসপাতাল সেটিংয়েও বাস্তবসম্মত পদপে দুর্বল রোগীদেরও রা করতে পারে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরিন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ সায়িদুল হক এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মো: শিব্বির আহমেদ ওসমানী এবং ইউএস সিডিসির ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর মিস্টার ব্রায়ান হুইলার।