শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে সব মহল থেকে আপত্তি আসছে। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের করোনা সময়কালের মতো আবারো মোবাইল কিংবা ডিভাইজমুখী করার পরিকল্পনা থেকে সরকারকে সরে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন অনেক শিক্ষাবিদ, শিক্ষক নেতা এবং অভিভাবকরা। ফলে গতকাল অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। সরকারও চাইছে এ বিষয়ে আরো ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে।
শিক্ষামন্ত্রী গতকাল জানিয়েছেন তিনিও বিষয়টি নিয়ে আরো একটু সময় নিচ্ছেন। আজ এবং আগামীকাল নিজেই শিক্ষাবিদ, শিক্ষক নেতা এবং সুযোগ মতো অভিভাবকদের সাথেও কথা বলবেন। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি পর্যবেক্ষণসহ মতামত মন্ত্রিপরিষদে পাঠাবেন। সেখান থেকেই মূলত আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাস চালুর এমন আলোচনার পর থেকেই স্যোসাল মিডিয়াতে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে অনলাইনে ক্লাস চালু না করার বিষয়ে জোর আপত্তি তোলেন। তারা এটাকে শিক্ষার্থীদের জীবনকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা বলেও অভিহিত করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অনলাইনে ক্লাস চালুর বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়। বক্তব্য-বিবৃতিতে এ বিষয়ে সরকারকে আরো ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। অবশ্য অভিভাবকদের একটি সংগঠন অনলাইনে ক্লাস চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। সংগঠনের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বিবৃতিতে সরকারের অনলাইন ক্লাস চালুর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে গত দুই দিন বিভিন্ন সংগঠন এবং শিক্ষাবিদদের নেতিবাচক বক্তব্যের পর তিনি আর কোনো বক্তব্য দেননি।
এদিকে গতকাল শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, স্টেকহোল্ডারদের সাথে কথা বলে আলোচনা সাপেক্ষে অনলাইন-অফলাইন কিভাবে এটাকে সিস্টেম্যাটিকলি ডিস্ট্রিবিউশন করা যায়। আমরা কাল পরশু স্টেকহোল্ডারদের সাথে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব এবং তারপর সেটা আমি ক্যাবিনেটকে জানাবো। তারপর ক্যাবিনেটই সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত হবে।
তিনি বলেন, ক্যাবিনেটে আমাদের স্টেক হোল্ডারদের ভিউ জানাতে হবে, তারপর ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নেবে। ইটস বেসজড অন স্টেক হোল্ডারস ডিসিশন। এটা আসলে হতেই হবে। এটা শুধু বাংলাদেশে না, এটা ওয়ার্ল্ড ক্রাইসিস। অনান্য দেশেও একইভাবেই জ্বালানি সাশ্রয়ের চেষ্টা চলছে। আমরাও সেদিকেই এগোচ্ছি। এটা নিয়ে ডিসিশন আজ আর নয়।
এর আগে গত শনিবার পৃথকভাবে বক্তব্য দিয়ে অনলাইন ক্লাস চালু না করার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান, শিক্ষকদের একাধিক সংগঠনের নেতারা। শিক্ষক-অভিভাবকদের অধিকাংশই মনে করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্যই যদি অনলাইন ক্লাস চালুর চিন্তা থাকে তাহলে ক্লাস টাইমে পরিবর্তন এনে সব স্কুল/কলেজে মর্নিং শিফট চালু করা যেতে পারে। এতে সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ১টার মধ্যেই স্কুল টাইম শেষ করতে পারলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনার অনেকটাই সফল হবে। প্রয়োজনে প্রতিটি ক্লাসের পাঠদানের সময়ও সমন্বয় করে স্কুলের টাইমিংয়ে আরো কাটছাঁট করার সুযোগ রয়েছে।
প্রাথমিকের শিক্ষকরা মনে করেন তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ এখনো অনলাইনে ক্লাস বা মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে প্রাথমিকের জন্য অনলাইন ক্লাস এখনো উপযোগী নয়। আবার দরিদ্র অঞ্চলে কৃষক পরিবারে ৯০ শতাংশ বাবা/মায়েরই সন্তানদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ডিভাইসই নেই। ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাসের উপকারিতা কতটুকু হবে তা শুরুর আগেই ভেবে দেখা দরকার।
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের সভাপতি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হোসাইন আজিজী জানান, আমরা শিক্ষকরা কেউই অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে নই। তবে প্রয়োজনে মর্নিং শিফট চালু করে স্কুলের সময়ে এ পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখন লাভেও কোনো ক্ষতির প্রভাব পড়বে না।
বাংলাদেশ আদর্শ কলেজ শিক্ষক পরিষদের সহসভাপতি অধ্যক্ষ রবিউল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান একটি ক্লাসরুমে যেখানে দুই থেকে তিনটি লাইট-ফ্যান চালিয়ে ৫০/৬০ জন শিক্ষার্থী অফলাইনে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারবে, সেখানে বাসায় বসে অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতে হলে ৫০ থেকে ৬০টি ফ্যান, লাইট ব্যবহৃত হবে। এছাড়া অনলাইন ক্লাসের ফিডব্যাক কতটুকু আসবে সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমার বিবেচনায় প্রয়োজনে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের পরিবর্তে একদিন কমিয়ে চারদিন শ্রেণী শিক্ষাকার্যক্রম সশরীরেই অব্যাহত রাখা যেতে পারে।



