কাওসার আজম কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে ফিরে
আগাম বন্যার ধাক্কায় হাওরের কৃষকের ঘুম উবে গেছে অনেক আগেই। কয়েক দিনের রোদে পানি নামতে শুরু করেছে। ডুবে থাকা অনেক জমি আবার জেগে উঠছে। পানির নিচে পড়ে থাকা পাকা ধানে ধরেছে পচন। কোথাও অঙ্কুর বেরিয়েছে, কোথাও ধান কালচে হয়ে গেছে। তবু শেষ সম্বল বাঁচাতে কোমর সমান পানিতে নেমে সেই ধানই কাটছেন কৃষকেরা। কেউ নৌকায় করে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে নিয়ে শুকাচ্ছেন। কেউ রাস্তার ওপর ধান মেলে দিচ্ছেন। আকাশে মেঘ জমলেই শুরু হচ্ছে ছোটাছুটি। কারণ, এই ধানই ছিল সারা বছরের ভরসা। এই ধান দিয়েই শোধ হওয়ার কথা ছিল ব্যাংকঋণ, সমিতির কিস্তি আর মহাজনের টাকা; কিন্তু এখন হাওরজুড়ে শুধু পচা ধানের গন্ধ, ভেজা খড় আর সর্বস্ব হারানোর আতঙ্কে ডুবে থাকা কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। আর ক’দিন পরে কোরবানির ঈদ। এবারের ঈদ নিরানন্দেই কাটবে হাওরবাসীর।
ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের অলওয়েদার সড়কের প্রায় ৩০ কিলোমিটারে চলছে ধান শুকানোর কাজ। কিশোরগঞ্জ থেকে নিকলী রাস্তা এবং রাস্তার নিচে উঁচু জায়গায় শুকানো হচ্ছে ধান। কোথাও রাস্তার একপাশে ধান ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও খড় শুকানো হচ্ছে। আবার কোথাও ট্রাক থেকে ভেজা ধান নামিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে। যানবাহন ধীরে চলছে। তবু কেউ অভিযোগ করছেন না। কারণ, এই সড়কই এখন কৃষকের শেষ আশ্রয়।
আলী হোসেন নামে এক কৃষক পুরো পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জ-নিকলী সড়কের পাশে উঁচু জায়গায় ধান শুকাচ্ছিলেন। কিষানি সুবরা খাতুন কুলা দিয়ে ধান উড়িয়ে ময়লা পরিষ্কার করছিলেন। তিনি বলেন, ‘চার দিন ধইরা রইদ পাইতাছি। খলা ভিজ্জা ফেক হইয়া গেছে। ধান শুকানোর জায়গা নাই। তাই বাড়ি থেকে দূরে এখানে এসে শুকাইতেছি।’
নিকলী হাওরে গিয়ে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া জলরাশির মধ্যে ছড়িয়ে আছে ডুবে যাওয়া ফসলের চিহ্ন। কোথাও পানির নিচে পাকা ধান। কোথাও কাটা ধান ভিজে নষ্ট হচ্ছে। বাতাসে ভেসে আসছে পচা ধানের গন্ধ। এই জলরাশির নিচেই চাপা পড়ে আছে হাজারো কৃষকের এক মৌসুমের স্বপ্ন।
নিকলী সদর ইউনিয়নের মিরহাটি গ্রামের কৃষক আবু তাহের পাঁচ একর জমি লিজ নিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন। নিকলী বাজারে ছোট ব্যবসা করতেন। সেই পুঁজিই কৃষিতে খাটিয়েছিলেন। জমি লিজ, বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। বন্যার আগে আড়াই একরের ধান কাটতে পারলেও বাকি জমি তলিয়ে যায়।
অষ্টগ্রামের মাদলার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, বড় নৌকায় ভেজা ধান তোলা হচ্ছে। সেই ধান আবার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিকলী বেড়িবাঁধে। সেখানে শুকানোর চেষ্টা চলছে। কৃষক মেরাজ মিয়া বলেন, এ বছর ১৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। সব জমিই লিজ নেয়া। ফলনও ভালো হয়েছিল; কিন্তু টানা বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে সব তলিয়ে যায়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, হাওরের খুব কম কৃষক নিজের পুঁজিতে চাষ করতে পারেন। মৌসুম শুরুর আগে ব্যাংক, এনজিও, সমিতি কিংবা মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিতে হয়। বোরো ধান উঠলেই সেই টাকা শোধ করার কথা ছিল; কিন্তু এবার ফসলহানির কারণে কৃষকেরা চরম সঙ্কটে পড়েছেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রান্তিক কৃষকেরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না। কাগজপত্র ও জামানতের জটিলতায় তারা মহাজনের কাছে যায়। অনেক সময় কম দামে ধান দিয়েই ঋণ শোধ করতে হয়। এবার ফসলই নাই। ফলে ঋণের চাপ আরো বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওরে এখন শুধু ধান নয়, পশুখাদ্যের সঙ্কটও প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় খড় পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে গবাদিপশু পালন নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। বেড়িবাঁধে কথা হয় আলী আকবর নামের এক কৃষক সাথে। তিনি বলেন, ‘খড় নাই। তাই গরু বিক্রি কইরা দিতে হইতাছে। খাওয়ামু কী?’
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, বন্যার ধাক্কা সামলানোর আগেই সামনে এসেছে কোরবানির ঈদ। অথচ অধিকাংশ কৃষকই এবার কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। কারণ, হাওরের বেশির ভাগ পরিবারই ঋণচক্রে বন্দী। ফসলই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা মনে করেন, এই বিপর্যয়ের পেছনে শুধু প্রকৃতি দায়ী নয়। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, অকেজো স্লুইসগেট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে। সময়মতো ধান কাটতেও পারেননি কৃষকেরা। শ্রমিক সঙ্কট, ডিজেলের সমস্যা ও যন্ত্র ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কৃষকের হাতে এখন আর পুঁজি নাই। ফলে আগামী মৌসুমে চাষ করাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে।
তবে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক মনে করেন, শুধু খাদ্য সহায়তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, কিস্তি পরিশোধে ছাড় এবং সুদ মওকুফের মতো পদক্ষেপ জরুরি।
এ দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)-এর পরিচালক ড. তৌফিকুর রহমান জানান, হাওরাঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ চলছে। স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল ধানের জাত, আধুনিক সেচব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র বিতরণ ও ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবু হাওরের কৃষকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই- এই ক্ষতি কাটিয়ে আবার কিভাবে দাঁড়াবেন তারা? কারণ, যে ধান ছিল সারা বছরের আশা, সেই ধানই এখন রাস্তার পাশে পচছে। আর হাওরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।



