কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৩ জুন চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাচ্ছেন। ২১ জুন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে দুই দিনের সফরের পর তিনি বেইজিং যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পে সহযোগিতাকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি আলোচনা হবে। এই সফরে বাংলাদেশ-চীন সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেয়ার ওপর জোর দেয়া হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে চীনের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে, যার ধারাবাহিকতা বেইজিং চায়। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো চীন। মূলত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চীনের সহযোগিতায় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মরহুম প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পথ ধরে বর্তমান বিএনপি সরকার চীনের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর চীনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বার্তা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের পর তারেক রহমানকে লেখা অভিনন্দনবার্তায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বাংলাদেশের সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নতুন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের ভিত্তি রচনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ৪ থেকে ৬ মে বেইজিং সফর করেছেন। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ১৬ এপ্রিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেইজিং সফর গেছেন। কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান চেংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন মির্জা ফখরুল। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার ‘একচীন নীতি’র প্রতি সংহতি প্রকাশ করছে এবং চীনের সাথে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সম্পর্ক বজায় রাখবে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। এই বৈঠক শেষে দেয়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা করেছে এবং একে অপরের মূল স্বার্থ সমর্থন ও প্রধান উদ্বেগগুলো নিরসনে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। দুই পক্ষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পঞ্চনীতিতে অটল থাকতে, উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের গতি বজায় রাখতে, পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন কৌশলের মধ্যে সমন্বয় গভীর করতে এবং চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ ‘একচীন’ নীতির প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর এপ্রিলে বেইজিং সফরের সময় চীনকে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। এর ভিত্তিতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে চীনের কাছে প্রকল্পের অর্থায়ন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায় (ফেইজ-১) বাস্তবায়নে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের প্রয়োজন, যার মধ্যে ৫৫ কোটি ডলার চীন থেকে ঋণের মাধ্যমে নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প, যার মূল লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীর অববাহিকার টেকসই ব্যবস্থাপনা। এই প্রকল্পের আওতায় কৃষি, সেচ, পানি সংরক্ষণ, নদীশাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মতো বিভিন্ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের পানিসঙ্কট নিরসনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। অল্প সময়ের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরুর ঘোষণা আসতে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ প্রথম তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চীনের কাছে প্রস্তাব দেয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও ভারতের সাথে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই না হওয়ায় পরিপ্রেক্ষিতে চীনকে এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রকল্প এলাকাটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর যোগাযোগ স্থাপনকারী ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত স্থানের কাছে হওয়ায় বেইজিংয়ের অন্তর্ভুক্তিতে দিল্লির উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে ২০২৪ এর বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর তৃতীয়বারের মতো শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতায় এলে ভারত তিস্তা প্রকল্পে বিকল্প অর্থায়নের প্রস্তাব দেন। তবে ভারতের দেয়া প্রস্তাবটি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের উদ্যোগকে ঝুলিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা হিসাবে বিবেচনা করা হয়।



