প্রায় ভুলে যাওয়া ক্রিকেটার থেকে বিশ্বকাপের নায়ক

Printed Edition
স্ত্রী চারুলতা রেমেশের সাথে সাঞ্জু স্যামসন : ক্রিকইনফো
স্ত্রী চারুলতা রেমেশের সাথে সাঞ্জু স্যামসন : ক্রিকইনফো

ক্রীড়া ডেস্ক

সাঞ্জু স্যামসন, যে ক্রিকেটারকে অনেকসময় ভারতের দলে প্রায় ভুলে যাওয়া নাম মনে করা হতো, সেই তিনিই হয়ে উঠেছেন টি-২০ বিশ্বকাপের অন্যতম নায়ক। নকআউট পর্বে প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে ৩২১ রান করে তিনি ভারতের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

পরশু আহমেদাবাদে ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল স্যামসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের শুরুতে তার দলে জায়গা পাওয়া নিয়েও খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে ওঠেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়দের একজন। ফাইনালে তার করা ৮৯ রানের ইনিংস ভারতকে ৯৬ রানের বড় জয় এনে দিতে বড় অবদান রাখে। যদিও ম্যাচসেরা পুরস্কারটি পান ভারতের পেস বোলার জাসপ্রিত বুমরাহ। স্যামসনের মতে, শেষের ওভারগুলোতে বুমরাহ যেভাবে বোলিং করেছিলেন, সেটিই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। তাই নিজের সাফল্যের বড় অংশই তিনি সতীর্থ এই পেসারের দিকে ঠেলে দেন।

তবে বাস্তবতা হলো, স্যামসনের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স না থাকলে ভারত হয়তো নকআউট পর্বে উঠতেই পারত না। সুপার এইটের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কলকাতায় কার্যত কোয়ার্টার ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন।

স্যামসনের ব্যাটিং ধরন আধুনিক টি-২০ ক্রিকেটের অনেক ব্যাটারের চেয়ে ভিন্ন। ক্রিজে খুব বেশি নড়াচড়া না করে নিখুঁত ফুটওয়ার্ক, ভারসাম্য ও সময়জ্ঞান দিয়ে তিনি রান করেন। তার প্রতিটি শটই যেন ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেটীয় শট, যা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে উপভোগ্য।

উইকেটরক্ষক-ব্যাটার হিসেবে তাকে দলের অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দীর্ঘ সময় উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও ব্যাট হাতে একই মনোযোগ ধরে রাখা সহজ নয়। তবু কঠোর অনুশীলন ও শান্ত স্বভাবই তাকে আলাদা করে তুলেছে।

ম্যাচ শেষে সাঞ্জু বলেন, ‘যে দিন থেকে আমি খেলা শুরু করেছি সে দিন থেকেই এই দিনটির স্বপ্ন দেখেছি। আমি খুবই কৃতজ্ঞ। আমার জার্নি অনেক রোমাঞ্চকর ছিল। ছিল অনেক উত্থান পতন। ম্যাচের আগে নিজের ওপর সন্দেহ ছিল, আমি ভাবতাম আমি এটা করতে পারব কি না। তবে সবকিছুর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি দেশের জন্য অনেক দিন ধরে খেলছি। আইপিএল খেলেছি। জাতীয় দলের ডাগ আউটে বসে অনেক কিছু শিখেছি। আমার মনে হয় এটা খুবই গুরুত্ব পূর্ণ কোনো কিছু ভালো করে দেখা ও তা থেকে শেখা। আমি হয়তো ৫০-৬০ ম্যাচ খেলেছি তবে আমি ১০০-এর অধিক ম্যাচ দেখেছি সাইড লাইনে বসে। আমি দেখেছি গ্রেট খেলোয়াড়েরা কিভাবে খেলেন কিভাবে ম্যাচ ফিনিশ করেন। বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার মতো গ্রেটদের থেকে শিখেছি।’

ফাইনালের চাপ নিয়ে টুর্নমেন্টসেরা ব্যাটার বলেন, ‘এই ম্যাচটি ভিন্ন ছিল। আমাদের পরিকল্পনা ছিল বড় স্কোরের। তাই শুরু থেকেই বড় শট খেলা শুরু করি। তবে আমাদের সাবধানী হতে হতো। কারণ বড় শর্টে উইকেট হারানোরও ভয় থাকে। তাই আমি চেষ্টা করেছি পার্টনারশিপ গড়ার। সাথে সাথে বড় শট ও খেলার। তবে কখোনো ভাবিনি এরকম স্পেশাল কিছু করতে পারব। এটা আামর জীবনের অন্যতম সেরা একটি দিন।

দর্শকদের ধন্যবাদ দিয়ে সাঞ্জু, ‘বলেন তারা মাঠে অনেক উৎসাহ জোগান, এনার্জি আনেন। তবে সবসময় একরকম যায় না। ঠিকমতো দায়িত্ব পালন না করতে পারলে দুয়োধ্বনিও শুনতে হয়। আমি শুধু আমার কাজে মনোযোগী হতে চেষ্টা করেছি এবং বল বুঝে খেলার ”েষ্টা করেছি।’

৩১ বছর বয়সী স্যামসন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেছিলেন ২০১৫ সালে। তখন তিনি কেবলই তরুণ। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলার মাধ্যমেই তিনি আলোচনায় আসেন। তবে একজন পরিণত ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ঘরোয়া ক্রিকেট, বিশেষ করে রঞ্জি ট্রফির মতো প্রতিযোগিতাগুলোর।

দীর্ঘ সময় তিনি খেলেছেন প্রায় ফাঁকা গ্যালারির সামনে, খুব বেশি আলোচনায় না থাকা ম্যাচে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুতেও সাফল্য সহজে আসেনি। ভারতের হয়ে প্রথম ২৩ ইনিংসে তার নামের পাশে ছিল মাত্র একটি অর্ধশতক। তবু নিজের পদ্ধতির ওপর আস্থা হারাননি তিনি। মাঝারি রান করে নিরাপদ থাকার পথ বেছে না নিয়ে সবসময় বড় প্রভাব রাখার চেষ্টা করেছেন। আর যখন তিনি ছন্দে থাকেন, তখন হয়ে ওঠেন ভয়ঙ্কর ব্যাটার। এই বিশ্বকাপে প্রায় ২০০ স্ট্রাইক রেটে ৩২১ রান তার সেই সামর্থ্যরেই প্রমাণ।

বিশ্বকাপের আগে খারাপ ফর্মের কারণে তিনি একাদশ থেকেও বাদ পড়েছিলেন। পরে ওপেনার অভিষেক শর্মা রান পাচ্ছিলেন না বলে তাকে ওপেনিংয়ে আনা হয়। আবার সতীর্থ রিঙ্কু সিং পারিবারিক কারণে দল ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় স্যামসনের সামনে আরো একটি সুযোগ তৈরি হয়।

টি-২০ ক্রিকেটে যেমন ছোট ছোট ব্যবধান অনেক কিছু বদলে দেয়, তেমনি কখনো কখনো সামান্য ভাগ্যও বড় ভূমিকা রাখে। স্যামসনের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ এসেছে ঠিক সময়েই।

দীর্ঘ এক দশকের ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম ও নিজের ওপর বিশ্বাসের ফল মিলেছে অবশেষে এই বিশ্বকাপে। এখন তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন নায়ক হিসেবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, হয়তো তার সেরা ক্রিকেট এখনো বাকি।