এআই ট্রাফিকে স্বস্তির বদলে বাড়ছে শঙ্কা

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • সড়কের পরিবেশ ঠিক না হলে শুধু মামলা বাড়বে
  • রিভিউয়ে রাখতে হবে পর্যাপ্ত সহজ সুযোগ
  • হালনাগাদ করতে হবে বিআরটিএর তথ্য ভাণ্ডার

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে ঘিরে রাজধানীতে চালক ও যানবাহন মালিকদের মধ্যে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও অনেকের অভিযোগ- সড়কের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত না করেই এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং অনেকে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় শঙ্কায় পড়ছেন।

চালক-মালিকদের বক্তব্য, আইন প্রয়োগে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। তবে তার আগে সড়কে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, অবৈধ যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ, লেন চিহ্ন ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন- এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন না হলে শুধু মামলার সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু প্রকৃত শৃঙ্খলা ফিরবে না বলে তাদের মত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেক নেটিজেন মনে করছেন, সড়কের পরিবেশ উন্নয়ন ছাড়া এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়াটা স্বাভাবিক। তাই অভিযোগ বা ভুল শনাক্তের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সহজ রিভিউ প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে চালকরা কখনো কখনো নিরাপত্তাজনিত কারণে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। সে ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যদি কেবল নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিংয়ের ভিত্তিতে কাজ করে, তবে পরিস্থিতির বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তারা আরো বলছেন, যেসব এলাকায় ডিজিটাল মামলা কার্যকর রয়েছে, সেখানে অবৈধ যানবাহনের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সাথে রাস্তায় লেন চিহ্ন ও সড়ক নির্দেশনা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন, যাতে চালকদের জন্য নিয়ম মেনে চলা সহজ হয়।

এআই কিভাবে কাজ করবে

গত জানুয়ারি থেকে রাজধানীর গুলশান ও মিরপুর এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এআইভিত্তিক ট্রাফিক মনিটরিং চালু করা হয়েছে। সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিগমাইন্ড জানিয়েছে, তাদের তৈরি ‘ট্রাফিকফ্লো’ সিস্টেম কম্পিউটার ভিশন, ‘ইমেজ টু টেক্সট’ প্রযুক্তি ও ডিপ লার্নিংয়ের সমন্বয়ে কাজ করে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের উল্টোপথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি গতি বা ট্রাফিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মতো আইনভঙ্গ শনাক্ত করা হয়। গাড়ির রঙ, ধরন ও নম্বর প্লেট শনাক্ত করে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নির্ধারণের সক্ষমতাও রয়েছে। শুধু শনাক্ত করাই নয়, তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।

সিস্টেমটি বর্তমানে বাংলাদেশে চলাচলকারী অন্তত ২৫ ধরনের যানবাহন শনাক্ত করতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। কোনো অননুমোদিত যানবাহন প্রবেশ করলে বা নিয়ম ভঙ্গ করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়বে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে, আবার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবেও মামলা জারি হতে পারে। ‘রি-আইডেন্টিফিকেশন’ প্রযুক্তির মাধ্যমে চুরি যাওয়া যানবাহন বা ভুয়া নম্বর প্লেটযুক্ত গাড়িও শনাক্ত করার সুবিধা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশের সার্ভারেই ডেটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

চালক-মালিকদের উদ্বেগ

চালক ও মালিকদের অভিযোগ, এআই একটি প্রোগ্রামভিত্তিক ব্যবস্থা; এতে মানবিক বিবেচনা বা পরিস্থিতিগত ব্যাখ্যার সুযোগ সীমিত। ফলে সামান্য বিচ্যুতিতেও মামলা হয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, সড়কে অবৈধ যানবাহনের উপস্থিতি, ফুটপাথ দখল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল এবং রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেলের বিশৃঙ্খলা- এসব সমস্যার সমাধান না করে কেবল ডিজিটাল নজরদারি চালু করলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না।

অনেক চালক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে লেন পরিবর্তন করলে সেটিকে আইনভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। তাই মামলার বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল বা রিভিউ করার সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা রাখার দাবি জানানো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত

যোগাযোগবিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: হাদিউজ্জামান মনে করেন, প্রযুক্তি নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না; সেটি নির্ধারিত প্রোগ্রামের ভিত্তিতেই কাজ করে। তাই সম্ভাব্য ভুল শনাক্তের ক্ষেত্রে দ্রুত রিভিউ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ডিজিটাল মামলা চালু করা হয়েছে, সেখানে অবৈধ যানবাহনের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তি ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, বিআরটিএর তথ্যভাণ্ডার নিয়মিত হালনাগাদ না থাকলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অনেক গাড়ির মালিকের স্থায়ী ঠিকানা গ্রামে হলেও তারা শহরে অবস্থান করেন। তথ্য আপডেট না থাকলে নোটিশ বা মামলার কপি ভুল ঠিকানায় যেতে পারে। একই লাইসেন্স দিয়ে একাধিক যানবাহন পরিচালনার নজির থাকায় সঠিক মালিক নির্ধারণেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব কারণে স্বচ্ছ ও নির্ভুল ডেটাবেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য

ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো: সরওয়ার জানান, আধুনিক প্রযুক্তি চালুর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে, তবে তা সমাধান করেই এগোতে হবে। ঢাকাকে আধুনিক মহানগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক শত ডিজিটাল মামলা হয়েছে। প্রযুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হলে মামলার সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকার সব রাস্তা এআই ব্যবহারের উপযোগী নয়। তাই ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট এলাকায় অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরো পয়েন্টে এটি চালু করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কেবল শাস্তি দেয়া নয়; বরং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, যানজট কমানো ও দুর্ঘটনা হ্রাস করা।

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো মনে করছে, এআই ট্রাফিক মনিটরিং সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে সফল বাস্তবায়নের জন্য সড়কের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, তথ্যভাণ্ডারের হালনাগাদ, রিভিউয়ের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ- এসব বিষয় সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।