রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হয়েছেন একসময়ের দাপুটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে নাঈমুর হাসান টিটন। গত মঙ্গলবার রাতের এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অপরাধ সাম্রাজ্যের একক আধিপত্য, দীর্ঘদিনের পুরনো শত্রুতা এবং আসন্ন কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী মোটিভ থাকতে পারে। প্রথমত, হারিস-জোসেফ বাহিনীর পুরনো প্রতিশোধ। নব্বইয়ের দশকে টিটন ও তার বোন জামাই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন হারিস-জোসেফ বাহিনীর সাথে কাজ করলেও পরে আলাদা হয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা হারিসের ভাই কুখ্যাত গ্যাংস্টার সাঈদ আহমেদ টিপুকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই টিটনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বোনজামাই ইমনের সাথে টিটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। কারাগারে থাকাবস্থায় তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব পরে চরম শত্রুতায় রূপ নেয়। ইমন দেশের বাইরে থাকলেও টিটন এলাকায় থেকে তার রাজত্ব দখলে রেখেছিলেন, যা ইমন পক্ষের অসন্তোষের কারণ হতে পারে। তৃতীয়ত, বর্তমানের শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও কাইল্লা বাদলের সাথে মোহাম্মদপুরের বসিলাসহ বিভিন্ন পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের নানামুখী তৎপরতা ও দ্বন্দ্ব এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপি রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো: মাসুদ আলম বলেন, ‘টিটনকে হত্যার ধরন দেখে মনে হচ্ছে খুনিরা অত্যন্ত পেশাদার। এই হত্যাকাণ্ডে অন্য কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী সরাসরি জড়িত কি না, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।’
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ ঘটনা ঘটেছে। মামলার এজাহারে মোহাম্মদপুরের বসিলার গরুর হাট নিয়ে দ্বন্দ্বের পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও কাইল্লা বাদলসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। আমরা সব দিক খতিয়ে দেখছি। বিদেশে অবস্থানরত কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৮টার দিকে নিউমার্কেটের বটতলার শহীদ শাহ নেওয়াজ হলসংলগ্ন সড়কে মোটরসাইকেলে এসে হামলাকারীরা টিটনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। টিটন সড়কে লুটিয়ে পড়লে খুনিরা কাছে গিয়ে আবারো গুলি চালিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। স্থানীয়রা ধাওয়া দিলে খুনিরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক টিটনের শরীরে সাতটি গুলির চিহ্ন পান এবং তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
২০০১ সালে প্রকাশিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন টিটন। টিপু ও অশ্রু হত্যা এবং চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যাসহ তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। যশোরে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তিনি এর আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন টিটন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তি পেলেও এরপর আর আদালতে হাজিরা দেননি তিনি, ফলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল।
এ দিকে হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে তার বড় ভাই সাজিদ আহমেদ রিপন যশোর থেকে ঢাকায় এসে নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৮-৯ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।



