বিশেষ সংবাদদাতা
- প্রচারণার ব্যয়সীমাসহ আচরণবিধির বহুমাত্রিক লঙ্ঘন
- নির্বাচনে ১৪৪ জন প্রার্থীর ব্যয় গড়ে ১.৬৫ কোটি টাকার বেশি
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সঙ্ঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি বলছে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে ‘বিজয়ী হতেই হবে’ এই চর্চাও অব্যাহত রয়ে গেছে। আর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮.৬ শতাংশ বা ১৪৪ জন প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণা ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে। ব্যয়সীমা অতিক্রান্ত প্রার্থী গড়ে এক কোটি ৬৪ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ টাকা ব্যয় করেছে।
টিআইবির ধানমন্ডির কার্যালয়ে গতকাল ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর, ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন রিফাত রহমান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো: মাহফুজুল হক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিংয়ের উদ্দেশ্যে মোট ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে প্রতিনিধিত্বশীল নমুনায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জালভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এবং ৪০ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। প্রচারণা ব্যয়ের সীমা (অনলাইন ও অফলাইন) একক ও যৌথভাবে ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, শীর্ষ দুই দল বিএনপি (৩২৭.৫ শতাংশ), ও জামায়াত (৩১৫.২ শতাংশ) প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই লঙ্ঘনের মাত্রা সর্বাধিক। জাতীয় পার্টি (১২৮.৬ শতাংশ), এনসিপি (১৯.০ শতাংশ)। ব্যয়সীমা অতিক্রান্ত প্রার্থী গড়ে এক কোটি ৬৪ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ টাকা ব্যয় করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা?
পর্যবেক্ষক নিবন্ধন কার্যক্রমে ত্রুটি- নাম সর্বস্ব এবং দলীয় রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট এবং পূবের্র রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন প্রদান। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রভাব, একাধিকবার আবেদনের পরও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন প্রদান করা হয়নি। অন্য দিকে দুইজন উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। বিদেশী পর্যবেক্ষকদের ব্যয়ভার নির্বাচন কমিশনের বহনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। যা কর্তৃত্ববাদী আমলের চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে সমালোচিত। কমিশন এবং পর্যবেক্ষকদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে আচরণবিধি প্রতিপালনে পরিপূর্ণ সফল হয়নি। কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন হলেও রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের অনেকের মধ্যে ‘বিজয়ী হতেই হবে’ এই চর্চা অব্যাহত ছিল। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকে সুস্থ প্রতিযোগিতার উপাদানগুলো আমরা দেখেছি। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসতে আসতে তা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ ছাড়া পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী অবস্থান ও তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ধারাবাহিকতায় যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বিশেষত বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন পরস্পরবিরোধী দু’টি জোটের প্রার্থীদের একাংশ এবং দলের মনোনয়ন না পেয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন- তাদের অনেকের মধ্যে এই ত্রিমুখী অসহিষ্ণুতা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতা হয়েছে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশেষ করে নারীদের ওপর অনলাইন ও অফলাইন হামলার ফলে তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বা নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করেছে। যার প্রতিফলন দেখা গেছে ভোটের ‘টার্ন আউট’ বা উপস্থিতির হারে। প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় ভালো মনে হলেও বাংলাদেশের মানদণ্ডে আশাপ্রদ নয়। তা ছাড়া ভোটারদের একাংশের মনে এই আস্থা হয়তো তৈরি হয়নি যে, ভোট দিলে তাদের জন্য ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন আসবে। এই আস্থাহীনতা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের ভোটদান থেকে বিরত থাকার কারণ হতে পারে। অন্য দিকে নতুন সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব সাম্প্রতিককালের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ড. জামান বলেন, সব প্রার্থী ও ভোটারদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সমঅধিকারভিত্তিক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নিরাপদ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অন্য দিকে নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ঘাটতি ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়ম, নিষ্ক্রিয়তা এবং অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কমিশনকে সহযোগিতার তুলনায় অসহযোগিতাই বেশি করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রধান দুই প্রতিপক্ষই কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। যা পরোক্ষভাবে কমিশনের নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টারই একটি ইঙ্গিত হতে পারে।


