বিশেষ সংবাদদাতা
তিন দিনের সরকারি সফরে গতকাল ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। এমন এক জটিল সময়ে এই উচ্চপর্যায়ের সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুরু থেকেই নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারার এই অবিচল নীতি এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটে তুর্কিয়ে সমর্থনের আরেকটি শক্তিশালী অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারে নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং বারবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময় আরাকানে (রাখাইন রাজ্য) রোহিঙ্গা জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ। ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৭ লাখে। আর ২০২৬ সালের শুরুতে এসে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও সশস্ত্র সঙ্ঘাতের কবলে পড়ে আরাকানে এখন মাত্র প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা অবশিষ্ট আছেন।
বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৪৫ হাজার থেকে এক লাখ ৫৩ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের ভেতরেই বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত শিবিরে চরম অবমাননাকর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে তাদের চলাচলের স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতা (২০২৪-২০২৬): ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে উত্তর আরাকানে সঙ্ঘাত তীব্র রূপ নেয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে বুথিডং টাউনশিপে ৪০টিরও বেশি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়, যার ফলে নতুন করে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। একই বছরের মে ও আগস্ট মাসে হোয়ার সিরি এবং নাফ নদীর অববাহিকায় সংঘটিত একাধিক নৃশংসতায় ২০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে ৯০ জনই ছিল শিশু।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ২০২৩ সালের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জীবন বাঁচাতে অনেকেই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের উদ্দেশে বিপজ্জনক যাত্রা করছেন, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
তুরস্কের দীর্ঘদিনের অবদান ও মানবিক নেতৃত্ব
২০১৭ সালের মহাসঙ্কটের শুরু থেকেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বিশ্বমঞ্চে অন্যতম সোচ্চার ও উদার দেশ হিসেবে ভূমিকা রাখছে তুরস্ক। আঙ্কারার এই অবস্থান কেবল আর্থিক অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংহতি এবং গভীর ব্যক্তিগত সহানুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তুরস্কের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার সশরীরে বাংলাদেশে এসে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন।
২০১৭ (সঙ্কটের সূচনা) : সঙ্কটের একেবারে শুরুর দিকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোগান, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুশওগ্লু এবং পরিবার ও সমাজনীতি বিষয়কমন্ত্রী ফাতমা বেতুল সায়ান কায়া কক্সবাজারের কুতুপালং শিবির পরিদর্শন করেন। তারা সরাসরি শরণার্থীদের দুর্দশা দেখেন এবং ত্রাণকার্যক্রমের তদারকি করেন। একই মাসে তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী রেজেপ আকদাও শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন।
২০১৮ : তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী নুমান কুর্তুলমুশ মাঠপর্যায়ের মানবিক প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করতে কক্সবাজার সফর করেন।
২০২৬ (সাম্প্রতিক প্রতিনিধিদল) : ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের ছেলে বিলাল এরদোগানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবির পরিদর্শন করেন। এই দলে তুর্কিয়ে সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থার (টিকা) প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ এরেনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা তুর্কিয়ে অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন মানবিক প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে রোহিঙ্গাদের সাথে ইফতারের সৌহার্দ্য বিনিময় করেন।
এ ছাড়াও মেহমেত আকিফ ইলমাজের নেতৃত্বে তুর্কিয়ে সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নিয়মিত সফর রোহিঙ্গাদের মনে এই বিশ্বাস সুদৃঢ় করেছে যে, তুরস্ক তাদের এই মানবিক বিপর্যয়কে ভুলে যায়নি।
মানবিক সহায়তার বিস্তৃতি ও পরিমাণ
রোহিঙ্গা শিবিরে তুরস্কের মানবিক সহায়তা কর্মসূচি একাধারে বিশাল এবং দীর্ঘমেয়াদি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও তুর্কিয়ে সুশীলসমাজের তথ্যমতে : ২০১৭ সালে তুরস্ক প্রাথমিকভাবে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তুরস্কের দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। ২০১৭-এর পরবর্তী সময়ে অ্যাফাদ, টিকা এবং তুর্কিয়ে রেড ক্রিসেন্ট সম্মিলিতভাবে তাদের সহায়তার পরিধি ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি করে। সামগ্রিকভাবে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তুরস্ক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ মানবিক সহায়তায় ব্যয় করেছে।
টেকসই প্রকল্প ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা
তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণের গণ্ডি পেরিয়ে তুরস্ক রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে মনোযোগ দিয়েছে। তুর্কিয়ে সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা জরুরি খাদ্যনিরাপত্তা, মানসম্মত আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ এবং একসময়ে প্রতিদিন ২৫ হাজারেরও বেশি শরণার্থীর জন্য গরম খাবার সরবরাহ করে। তুর্কিয়ে রেড ক্রিসেন্ট বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করে। তুর্কিয়ে ফিল্ড হাসপাতাল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে তুরস্কের ফিল্ড হাসপাতালটি চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হাসপাতালটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তুরস্ক অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এটিকে পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করে। এখানে তুর্কিয়ে ও স্থানীয় চিকিৎসকরা দিনরাত সেবা দিচ্ছেন।
এ ছাড়াও, যুবকদের স্বনির্ভর করতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তুরস্ক শরণার্থীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর : প্রত্যাবাসনের নতুন আশা
তুর্কিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই সফর রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠী মনে করছে, তুরস্কের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিশ্বমঞ্চে তাদের অধিকারের পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
মানবিক সহায়তা শরণার্থীদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান কেবল একটি উপায়েই সম্ভব- তা হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আরাকানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার, জানমালের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ হিসেবে তুরস্ক এই বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে একটি অগ্রণী ‘অনুঘটক’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রসঙ্গত নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তুরস্ক বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কোটি কোটি ডলারের মানবিক সাহায্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে তুরস্ক আজ রোহিঙ্গাদের হৃদয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ত একটি নাম।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই ঢাকা সফর বাংলাদেশ ও তুরস্কের যৌথ কূটনৈতিক প্রয়াসকে আরো শক্তিশালী করবে বলে আশা করা যায়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত-নিজেদের মাতৃভূমি আরাকানে ফিরে যাওয়ার যে স্বপ্ন, তা বাস্তবায়নের পথে এই সফর একটি কার্যকর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হোক- এটাই আজ বিশ্ববাসীর কাম্য।



