ঝুঁকি মোকাবেলায় পুঁজিবাজারের সমন্বিত উদ্যোগে গুরুত্বারোপ

সূচকের মিশ্র আচরণেও লেনদেন বেড়েছে ডিএসইর

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের মিশ্র আচরণের মধ্য দিয়ে গতকাল সপ্তাহ শেষ করেছে ঢাকা শেয়ারবাজার। প্রধান সূচকটির পাশাপশি ডিএসই শরিয়াহ নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে পারলেও অবনতির শিকার ছিল ডিএসই-৩০ সূচকটি। তবে এ দিন দেশের দ্বিতীয় শেয়ারবাজারের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে গতকাল সবগুলো সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে সূচকের মিশ্র আচরণেও লেনদেনের উন্নতি ঘটে ঢাকা শেয়ারবাজারে। সপ্তাহের শেষ দিন হিসেবে সূচকের আচরণ মিশ্র হলেও লেনদেনের উন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক দিনের ধারাবাহিক পতনের পর সম্প্রতি বাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত ছিল। গতকালও দিনের শুরুতে ভালোই ছিল বাজার। তবে সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস হিসাবে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজার। এর মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল আশাপ্রদ। গতকাল প্রায় হাজার কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে ঢাকা শেয়ারবাজার, যার ৬৩ কোটি টাকা ছিল ব্লক মার্কেটে। তা ছাড়া দিনের বাজার আচরণে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি খাত বাদ দিয়ে বাকি খাতগুলোর বেশির ভাগ কোম্পানিরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। বাজার সংশ্লিষ্টরা এটাকেই বাজারের ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ হিসাবে দেখছেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ২৪৩ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট দিয়ে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে ৫ হাজার ২৪৫ দশমিক ২২ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি ১ দশমিক ডিএসই-৩০ সূচকটি ৯ দশমিক ০৪ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। তবে দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩৫ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। এখানে সিএসই-৩০ ও সিএসইসএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৩৮ ও ২৫ দশমিক ৫২ পয়েন্ট।

সূচকের মিশ্র আচরণ সত্ত্বেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। এদিন ডিএসই ৯৯৭ কোিিট টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইতে ১৪১ কোটি টাকা বেশি। গত বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮৫৬ কোটি টাকা। তবে সূচকের উন্নতি ঘটলেও লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল ১৮ কোটিতে নেমে আসে সিএসই লেনদেন। বুধবার বাজারটির লেনদেন ছিল ৩৪ কোটি টাকা।

এ দিকে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কার্যকর পদপে গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় শেয়ারবাজারকে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

বুধবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত ‘স্থিতিশীল শেয়ারবাজার : অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনের পরিপালন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। ডিএসইর রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পরিচালক সৈয়দ কামরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক মো: ওহিদুল ইসলাম।

স্বাগত বক্তব্যে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় শেয়ারবাজার অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, সাইবারভিত্তিক আর্থিক অপরাধ, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার এবং বাজার কারসাজির মতো বহুমাত্রিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এসব ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আর্থিক খাতের সুশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রোপটে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের জন্য অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনভিত্তিক শেয়ারবাজার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশেষ অতিথি মো: ওহিদুল ইসলাম বলেন, একটি স্বচ্ছ, সহনশীল ও আস্থানির্ভর শেয়ারবাজার গঠনে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও অর্থপাচার বাজারের স্বচ্ছতা নষ্ট করে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি এটি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে।

কর্মশালায় চারটি কার্য অধিবেশন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অতিরিক্ত পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন, উপপরিচালক মেহেদী হাসান, বিএসইসির উপপরিচালক মো: রফিকুন্নবী এবং বিএফআইইউর যুগ্ম পরিচালক শাহ আলম কাজী।

এ দিকে গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এনসিসিবি)। ৩৭ কোটি ১৬ লাখ টাাকয় কোম্পানিটির ২ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকায় ১ কোটি ১ লাখ ৯২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে শাইনপুকুর সিরামিকস উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, মেঘনা ইন্স্যুরেন্স, ভিএফএস থ্রেড, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, মুন্নু সিরামিকস, আর ডি ফুডস, বিবিএস ক্যাবলস ও লাভেলো আইসক্রিম।

এদিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে বীমা কোম্পানি ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এম এল ডাইং, রূপালি ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিকস, ভিএফএস থ্রেড, সোনারবাংলা ইন্স্যুরেন্স, আমান ফিড, ফার্মা এইড ও ইভিন্স টেক্সটাইলস।