গুমের বিচার শুরু ট্রাইব্যুনালে

শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত পরিকল্পিত গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদী শাসনকৌশল এমন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুমসংক্রান্ত এক ঐতিহাসিক মামলার বিচার শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরো ১২ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমন, ভয় সৃষ্টি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর ১০(ঘ) ধারা অনুযায়ী দায়ের করা আইসিসি সিসি কেস নং ০৫/২০২৫-এর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর। বিচারক বেঞ্চে রয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো: এনায়েতুল আলম মাহমুদ এবং সদস্য বিচারপতি মো: মহিতুল হক আনাম চৌধুরী।

‘গুম ছিল রাষ্ট্রীয় নীতি’ : প্রসিকিউশন জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশে গুম ছিল কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা লঙ্ঘন নয়; বরং এটি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতি। বিরোধী রাজনৈতিক চিন্তার মানুষদের আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা, নির্যাতনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করা এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী পঙ্গুত্ব সৃষ্টি এসবই ছিল ওই নীতির অংশ।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, গুমের মাধ্যমে রাষ্ট্র এমন এক ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে পরিবার জানত না নিখোঁজ ব্যক্তি জীবিত না মৃত। এ অনিশ্চয়তাই ছিল গুমের প্রধান রাজনৈতিক কার্যকারিতা।

মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গুম : আদালতে জানানো হয়, বলপূর্বক গুম আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধ। কারণ এটি একযোগে একাধিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে জীবনের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, আইনি সুরক্ষার অধিকার এবং ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার।

প্রসিকিউশন দাবি করে, গুমের মাধ্যমে মানুষকে ‘জীবিত ও মৃতের মাঝখানে’ ঝুলিয়ে রাখা হয়। এতে শুধু ভুক্তভোগী নয়, তার পরিবার ও সমাজও শাস্তি পায়।

ডিজিএফআই ও ‘আয়নাঘর’-এর অভিযোগ : এ মামলার কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই)-এর অধীনে পরিচালিত কথিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি), যা পরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এখানে অন্তত ২৬ জনকে গুম করে রাখা হয়, যারা পরে বিভিন্নভাবে জীবিত ফিরে আসেন।

প্রসিকিউশন জানায়, এ ২৬ জন ছাড়াও আরো অসংখ্য মানুষ জেআইসিতে আটক ছিলেন, যাদের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলমান।

শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামি : মামলায় মোট ১৩ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের পাঁচজন সাবেক মহাপরিচালক (মেজর জেনারেল পদ মর্যাদার), কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিটিআইসি) পাঁচজন পরিচালক, একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, যিনি গুম ও নির্যাতনে বিশেষ পারদর্শিতার অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাক্ষ্য ও প্রমাণ : প্রসিকিউশন জানায়, মামলার প্রধান ভিত্তি হলো গুম থেকে ফিরে আসা ভুক্তভোগীদের সরাসরি সাক্ষ্য, তাদের পরিবারের জবানবন্দী, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, মোবাইল লোকেশন ডেটা, জিডি ও আদালতে দায়ের করা আবেদনসহ বিভিন্ন নথিপত্র। সরকারি ও বেসরকারি তদন্ত প্রতিবেদনেও গুম ও নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে আদালতে জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক নজিরের উল্লেখ : প্রসিকিউশন আর্জেন্টিনা, চিলি ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সংঘটিত গুমের বিচার, রোম স্ট্যাটিউট, জাতিসঙ্ঘের গুমসংক্রান্ত কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আদালতের বিভিন্ন রায়ের নজির তুলে ধরে জানায় গুম শুধু ভুক্তভোগীকেই নয়, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও দুর্বল করে।

‘এ বিচার ভবিষ্যতের জন্য বার্তা’ : প্রসিকিউশনের বক্তব্যে বলা হয়, এ বিচার শুধু অতীতের অপরাধের দায় নির্ধারণের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। গুমের বিচার না হলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী শেখে মানুষকে অদৃশ্য করা যায়। কিন্তু বিচার হলে রাষ্ট্র শিখবে কোনো অবস্থাতেই কাউকে গুম করা যাবে না।

আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি রাষ্ট্রীয় গুম নিয়ে প্রথম এত বড় পরিসরের বিচার, যা মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।