চট্টগ্রামের ডিসি জাহিদের মানবিকতায় জেলে পরিবারে ফিরল হাসি

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ঘড়ির কাঁটায় তখন বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৪ মিনিট। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সরকারি বাসভবনের একটি কক্ষে বসে দাফতরিক ফাইলপত্রে স্বাক্ষর করছিলেন। ব্যস্ত প্রশাসনিক দিনের শেষে কাজ তখনো শেষ হয়নি। ফাইলের পর ফাইল, সিদ্ধান্তের পর সিদ্ধান্ত। এরই ফাঁকে মোবাইল ফোনে চোখ বুলাচ্ছিলেন বিভিন্ন সংবাদে।

হঠাৎ একটি শিরোনামে তার আঙুুল থেমে যায়- “আমরা গরিব মানুষ, ৮০ হাজার দিয়েছি, তবু হাসপাতাল থেকে মেয়েকে ছাড়ছে না।”

একটি শিরোনাম। কয়েকটি বাক্য। কিন্তু সেই কয়েক লাইনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক বাবার অসহায়ত্ব, এক মায়ের কান্না, আর মৃত্যুর সাথে লড়াই করা পাঁচ মাস বয়সী একটি শিশুর গল্প। শিশুটির নাম জয়া দাস।

চার ছেলের পর জন্ম নেয়া পরিবারের একমাত্র মেয়েসন্তান। জেলেপল্লীর এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া জয়া হামে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালের আইসিইউ ও কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিল। শিশুটির বাবা সুমন জলদাসের ভাষায়, মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি নিজের সব সঞ্চয় শেষ করেছেন। স্ত্রীর গয়নাও বিক্রি করেছেন। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৮০ হাজার টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৩০২ টাকায়। বাকি টাকা পরিশোধের সামর্থ্য ছিল না তার।

অন্য দিকে হাসপাতালের কক্ষের ভেতরে তখন এক মায়ের নির্ঘুম অপেক্ষা। চার ছেলের পর পাওয়া মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তিনি শুধু তাকিয়ে ছিলেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

রাতেই জেলা প্রশাসক জাহিদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এরপর নিজেই যোগাযোগ করেন জেলা সিভিল সার্জন ও এশিয়ান স্পেশালাইজড হাসপাতালের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলীর সাথে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আজ যদি আমার নিজের পরিবারের কোনো অসুস্থ শিশু চিকিৎসা শেষে শুধু অর্থের অভাবে আটকে যায়, তাহলে কেমন লাগত আমার?

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রয়োজনে বকেয়া বিল জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিশোধের বিষয়েও তিনি ইতিবাচক অবস্থান নেন। ফোনের ওপাশ থেকে আসে তাৎক্ষণিক উত্তর।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলী বলেন, স্যার, আপনি বলেছেন, এটাই যথেষ্ট। বিল কোনো বিষয় নয়। আপনি সকালে হাসপাতালে আসুন, শিশুটিকে দেখেও যান। আমরাও মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। এরপর যেন গল্পের মোড় বদলে যায়।

গতকাল সকালে চট্টগ্রামের জিইসি এলাকার এশিয়ান স্পেশালাইজড হাসপাতালে পৌঁছান জেলা প্রশাসক।

তার সাথে ছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো: কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: শরীফ উদ্দিনসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। উপস্থিত ছিলেন হাসপাতাল চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।

এ সময় জেলা প্রশাসকের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বকেয়া এক লাখ ৫৮ হাজার ৩০২ টাকা মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাত ১টা-২টাতেও জেলা প্রশাসক বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যান। কোনো রোগী আর্থিক সঙ্কটে পড়লে তিনি খবর নেন, কথা বলেন, সহযোগিতা নিশ্চিতের চেষ্টা করেন। তিনি শুধু এখানে নন, প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নেন।

শুক্রবার দুপুরে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জয়ার বাবা সুমন জলদাস বলেন, আমি কখনো ভাবিনি ডিসি স্যার এসে আমার মেয়ের সব বিল এভাবে মওকুফ করে দেবেন। স্যার যদি সহযোগিতা না করতেন, তাহলে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো, মাইকিং করতে হতো।

তিনি বলেন,আমি হাসপাতালকে বলেছিলাম, আমি ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি, এর বেশি পারব না। আমার মেয়েটাকে আমাকে দিয়ে দেন। মেয়ের জন্য জেলেও যেতে রাজি ছিলাম।