পাহাড়কে উত্তপ্ত করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। হত্যাকাণ্ড ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড সামনে এনে ওই সংগঠনগুলো এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করছে বলে একাধিক সূত্র জানায়।
স্থানীয় ও গোয়েন্দাদের সূত্রমতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টসহ (ইউপিডিএফ-প্রসীত) অন্যান্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন তাদের নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতা জানান দিতে এরই মধ্যে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে পাহাড়কে উত্তপ্ত করতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। অপরদিকে নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) সদস্যরা মহড়া দিচ্ছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ে গোপন মিটিং ও নানাবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউপিডিএফ এবং চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বৈঠক করেছে।
স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাঙ্গামাটি সদর উপজেলায় প্রতিপক্ষের ব্রাশফায়ারে ধর্ম সিংহ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ নেতা নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। ইউপিডিএফ জানায়, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন ধর্ম সিংহ। এ সময় জন সংহতি সমিতির ১৯ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল বাড়িটি ঘিরে ফেলে। পালাতে চেষ্টা করলেও অস্ত্রধারীদের ব্রাশফায়ারে ঘটনাস্থলেই মারা যান ধর্মসিং। এ সময় ধর্ম সিংয়ের দুই বোনও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানায় ইউপিডিএফ। নিহত ধর্মসিং চাকমা ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রণাধীন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র আরো জানায়, এই পাহাড়ে চাঁদাবাজি-দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে নিতে পরিকল্পিতভাবে পাহাড়কে অশান্ত করতে (ইউপিডিএফ-প্রসীত) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়কে শান্ত রাখতে সেনাবাহিনী যথেষ্ট ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছেন। সম্প্রতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যে নীলনকশা তৈরি করছে এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বড় পরিকল্পনার অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত করতে দীর্ঘ দিন ধরেই ষড়যন্ত্র হয়ে আসছে। সীমান্তের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন পক্ষ এখানে তৎপর। ইউপিডিএফ বা জেএসএসসহ অন্য যারা আছে তারা পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে মাত্র, তাদের সব কিছুই সীমান্তের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সবাই আমাদের লোক, তারা সবাই বাংলাদেশী। কেউ আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু কিছু মানুষ (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর) আছে, যারা উসকানি ও গুজবে নাচতে থাকেন। এখানে ছোট কিছু গ্রুপ আছে, যারা পরিকল্পিতভাবে পাহাড়কে অশান্ত করতে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এর আগে গত ৮ এপ্রিল খাগড়াছড়িতে নিউটন চাকমা ওরফে নির্মল নামে ইউপিডিএফ’র প্রসীত গ্রুপের এক সদস্য দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। গত ১ মার্চ থেকে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে করে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ভারী আগ্নেয়াস্ত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে চোরাইপথে এনে পাহাড়কে অশান্ত করতে চক্রান্তে লিপ্ত। এর নেপথ্যে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর মারমা সম্প্রদায়ের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে খাগড়াছড়ি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা কয়েক দিন ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।
একপর্যায়ে প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাগড়াছড়ির গুইমারা এলাকায় ব্যাপক সঙ্ঘাত হয়। এতে তিনজন পাহাড়ি বাসিন্দা নিহত এবং ১৩ জন সেনা ও তিনজন পুলিশ সদস্যসহ অনেকে আহত হয়েছেন বলে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’র ব্যানারে মহাসমাবেশের সময় গুজব ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। এতে তিনজন সেনাসদস্য আহত হন। পর দিন ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় খাগড়াছড়িতে সড়ক অবরোধের সময় ইউপিডিএফের গুলিতে একটি টমটম গাড়ির চালক আহত হন। এ ছাড়া আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকায় একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করা হয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। গুইমারায় ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউপিডিএফএর (মূল) উসকানিতে গত বছর খাগড়াছড়িতে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা পার্বত্য অঞ্চলের অন্য সংগঠন জেএসএসসহ (মূল) আরো অনেককে একতাবদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা দেশী-বিদেশী অস্ত্র সরঞ্জামের মজুদ বাড়াচ্ছে এবং উস্কানিমূলক তথ্য ছড়াচ্ছে। এক বছর না পেরোতেই ফের উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে তারা উঠে পড়ে লেগেছে।


