ইরফান তানভীর
বিয়ের কিছু দিন যেতে না যেতেই ইকবালের জীবনে এত বড় বেসামাল ঝড় যে কিভাবে চলে এলো, সে কোনোভাবেই এর ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে না। কোনো রকম বলাকওয়া ছাড়াও যে এরকম বিব্রতকর বিপদের মুখোমুখি সে হবে তা কোনো দিন ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। রুম্মানার সাথে বিয়ে হলো মাত্রই কিছু দিন হলো। কিন্তু গত কিছু দিন আগে সে এমন বিব্রতকর বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, যা সে না পারছে কাউকে বলতে কিংবা কারোর কাছে যে সমাধান তালাশ করবে, এটিও তার কাছে বিব্রতকর মনে হচ্ছে। এরকম বহুমাত্রিক বিব্রতকর পরিস্থিতি নিয়ে সে একদিন আমাকে ফোন করে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানালে আমি তাকে আমার সাথে দেখা করতে বলি। বলে রাখা ভালো, আমি কোনো সাইক্রিয়াট্রিস্ট না, অথবা কোনো ধরনের ইনফ্লুয়েন্সারও না! আমি নিতান্ত একজন সাদামাটা তরুণ। জীবনবোধকে নানান আঙ্গিকে দেখার সুযোগ হয়েছে বিধায় পরিচিতজনরা আমাকে অভিজ্ঞ মনে করেন! সে দায় একান্ত তাদেরই। ইকবালের সাথে আমার বন্ধুবৎসল সম্পর্কের দায়ে তার এরকম দুর্দিনে আমার মন আসলেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। সেদিন খুব ভোরেই ইকবাল আমার কাছে এলো শিশুর বদন নিয়ে। তার চোখগুলো কোটরে ঢুকে এতটুকুন হয়ে গেছে। আর তার শ্যামবর্ণ চেহারাতে স্পষ্ট হাহাকারের ছাপ আমি আবিষ্কার করলাম। মনে হলো খুব ভীষণ ব্যথার একটি দলা তার বুকে বিদ্ধ হয়ে আছে। সে দলা জলীয় বাষ্পের মতো বাষ্প ছড়াতে ছড়াতে তার চেহারা জুড়ে লুটোপুটি খাচ্ছে।
রুম্মানার সাথে বিয়ের কিছু দিন গড়াল তখন। ইকবাল খুব যে বিলম্ব কিংবা তাড়াতাড়ি বিয়ে করেছে, তার কোনোটিই নয়! সে একদম যুতসই সময়ে বিয়ে করে ফেলেছে দেখে আমরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে এসেছিলাম এই কিছু দিন আগেই।
আজ সে আমাকে জড়িয়ে ধরে মেলায় বাবাকে হারিয়ে ফেলা শিশুর মতো কেঁদে কেঁদে এতটুকুই বলছে, বা কান্নার ভীষণ গমকে এতটুকুই আমার বোধগম্য হলো-সে এখন ভালো নেই। তার স্বপ্নের জগৎ খসে পড়েছে। রুম্মানা তাকে ডিভোর্স দেয়ার কথা বলেছে সেদিন! মাঘ মাসের বিকেলের ঠাণ্ডা বাতাসের মতো একটি হিমশীতল বাতাস যেন আমার বুকের ভেতর চক্কর দিয়ে গেল। আমি নিজেকে খুব স্বাভাবিক রেখে তার হাত ধরে ফিক করে হেসে ফেললাম।
আমি জানি, তার এহেন কষ্টের কথা শুনে আমার হাসিমুখ সে কখনো আশা করে না, বা সমাজস্বীকৃতও না। তবুও আমার মনে হলো-কষ্টকে হাসির মাধ্যমে জয় করা সম্ভব, কারণ হাসি মানসিক চাপ কমাতে এবং প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। যখন কেউ হাসে, তখন তার শরীর থেকে এমন রাসায়নিক নিঃসৃত হয় যা ব্যথা কমাতে এবং ভালো অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে। কঠিন সময়ে কাউকে হাসতে দেখলেও নিজের ব্যথা উপশম হতে পারে।
রুম্মানা ঠিক কী কারণে তার সাথে সম্পর্কের জায়গাটা আর রাখতে চাইছে না তা আমার অনুমেয় নয়। ইকবালের কলুষতা কেবল ততটুকুই, যতটুকু ভ্রান্তি না থাকলে মানুষ ফেরেশতা হয়ে যায়। আর ইহজীবনে মানুষের আদতে ফেরেশতা হওয়া সম্ভব না। স্কুলে আমাদের কত ধরনের বাজে আড্ডা কিংবা জীবনের নানান কিছু নিয়ে কতভাবে যে হেঁয়ালিপনা ছিল, কিন্তু ইকবাল ছিল ঠিক ভিন্ন এক মেরুর মানুষ। তাকে না কখনো কোনো মেয়ে-সংক্রান্ত ইত্যাকার কোনো কিছুতে পেয়েছি, না সে কখনো কোনো কিছুর সাথে প্রতারণা বা নিজেকে এক দিনের অথবা এক মুহূর্তের জন্য ঠগ বানিয়েছে-তার কোনো স্মৃতি আমাদের জানা নেই।
ইকবাল মানুষের জন্য কেমন, তার আগে মনে পড়ল তার পশুপাখির প্রতি দয়ার্দ্র মনোভাবের স্মৃতি। নিজের জন্য আমরা আনন্দের অনেকরকম উপাদান বের করলেও সে আনন্দ লাভের উৎস বানিয়েছে শিশু, গরিব-দুঃখীকে খাবার আর সেবা-শুশ্রƒষা দিয়ে। ঠিক কী কারণে রুম্মানা বিয়ের কিছু দিনের মাথায় এমন একটি ছেলের সাথে থাকতে চাইছে না-তা আমি অনুমান করে কোনোভাবেই উদ্ধার করতে পারিনি!
আমরা হাঁটছি ফেনী নদীর পাড় ধরে। নদীর পানি আর সবুজের প্রকৃতি অসাধারণ মনোহর সৃষ্টি করলেও ইকবালের হৃদয়ে ব্যথার যে তরঙ্গ বেজে চলছে, তাতে আমারও মন বিষণœ হয়ে আছে। দীর্ঘসময় নিশ্চল অবস্থায় থেকে আমি তাকে প্রথমেই যেটি জিজ্ঞেস করি, তা হলো-তোদের বিয়ে নিয়ে পারিবারিক কোনো জটিলতা কি ছিল?
মানে, তোকে রুম্মানার পরিবারের কেউ অপছন্দ করত কিনা, যে তোর সাথে রুম্মানার বিয়ে হোক-এমনটি চাইনি। অথবা তোর পরিবারের কেউ কি তাকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে অমত দিয়েছিল কিনা?
ইকবাল খুব দ্রুতই মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে না বলল!
তুই নিশ্চিত? হুঁ।
তাহলে তোকে কি রুম্মানা অপছন্দ করত? বা পছন্দ করেনি?
তা হবে কেন! সে তো আমাকে পছন্দ করল বলেই বিয়ে হয়েছে।
আমি চুপ মেরে যাই।
আমি জানি, ইকবাল নিছক কোনো সারবত্তাহীন ‘ফ্যান্টাসি’ থেকে বিয়ে করেনি। সে নিতান্ত সহজ-সরল বা ইতিবাচক মনোভাবের হলেও জীবনবোধের যতটুকু ধারণা একজন পুরুষের থাকা উচিত, তা তার আছে; বরং তুলনামূলকভাবে একটু বেশি-ই বৈকি। কিন্তু সে ইকবালই বিয়ে-পরবর্তী জীবনে অল্প কিছু দিনের মাথায় এসেই হাঁপিয়ে উঠেছে! তার চেহারা এমন বিষণœতায় ছেয়ে গেছে যে, তার দিকে তাকালেই আমার মন হুহু করে কেঁদে উঠছে!
রুম্মানা অনেক গম্ভীর ধরনের মেয়ে। সে হুট করেই এমন কিছু বলে ফেলে, যে আমি বিধ্বস্ত হয়ে যাই। গম্ভীরতাকে আমি অপছন্দ করি, এমন না! কিন্তু ভাবগাম্ভীর্যের সাথে কোনো কটুকথা আমি নিতে পারি না! হতে পারে এটি আমার সাইকোলজিক্যাল সমস্যা। কিন্তু আমি হিসাব মেলাতে পারি না-আমি যার কাছে কিছু দিন আগেও অসাধারণ একটি মানুষ ছিলাম, ঠিক একই আমি ক’দিন পর এমন ঘৃণিত হলাম যে, সে আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে! এর কোনো যৌক্তিক কারণও সে বলে না।
আমি তাকে আচরণগত কোনো কষ্ট দিইনি এবং নারীর মনস্তত্ত্ব পড়ার সক্ষমতা তো আমার আছে। এমনো না যে, আমার পুরুষ সাইকোলজি যেরকম প্রত্যাশা করে, সেরকম কিছু না হলে আমি তাকে দোষারোপ করি; এমনটি আমি সাবধানতার সাথেই সমন্বয় করি। আমি সবসময় পুরুষ মনস্তত্ত্ব আর নারী মনস্তত্ত্ব যে এক নয়, তা মনে রাখার চেষ্টা করি। এত সাবধানে হাঁটার পরও আমার পায়ে কেন কাঁটা বিদ্ধ হচ্ছে-আমি বুঝতে পারছি না!
একনাগাড়ে এ কথাগুলো বলেই ইকবাল এক প্রকার অভিমানী শিশুর মতোই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। ইকবালের কান্নায় আমি এক ধরনের অপ্রস্তুত ও অপ্রসন্ন হয়ে উঠলাম।
যাবার সময় ইকবালকে কেবল এতটুকুই বললাম-সব ঠিক হয়ে যাবে। কেবল চাপমুক্ত থাকতে হবে। আর সময় পেলে রুম্মানাকে নিয়ে আসিস একদিন। তুই একটা কাজ করতে পারিস-রুম্মানাকে সাথে নিয়ে এলাকা কিংবা আশপাশের বিবাহিত নারী-পুুরুষের সাথে দেখা করবি। তাদের সংসার জীবনের গল্প শুনবি। এতে রুম্মানা তোকে মার্কিং করতে পারবে। যদি তার চোখে তুই তখন ভালো সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হস-পৃথিবীর কোনো কিছুই তোদের সম্পর্কের দেয়াল হতে পারবে না!
দীর্ঘদিন হলো গ্রাম ছেড়েছি। শহর-বন্দর ঘুরে আমি তখন মরুপ্রবাসী। অনেক দিন ধরেই পুরনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে থিতু হওয়ার পর সেবারই দীর্ঘ বছর পর ইকবালের সাথে দেখা-খুবই কাকতালীয়ভাবে।
ইকবালই প্রথম আমাকে চিনতে পেয়ে একপ্রকার চিৎকার দিয়ে উঠলে বিশ্বের দ্বিতীয় শপিংমল ‘দুবাই মল’ ঘিরে থাকা অসংখ্য মানুষজনের চোখজোড়া যেন ক্ষণিকের জন্য আমাকে নজরবন্দী করে তুলল। আমি কিছুটা আতঙ্কিত এবং শঙ্কিত হয়েই ইকবালের প্রশস্ত বুকের মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে মনে পড়ল-সেই ইকবাল, আমার সেই বন্ধু-বিয়ের কদিন পরে যে আমার কাছে তার সমস্যার সমাধানের জন্য এসেছিল!
বুক থেকে আলগা হতে হতে খেয়াল হলো-ইকবাল কাঁদছে। আমি প্রথমেই তাকে আনমনে যে প্রশ্নটি করে বসি-
তোর আর রুম্মানার সম্পর্ক কতদূর পর্যন্ত গিয়েছিল?
ইকবাল এবার আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
ইকবালের পেছনেই-একপ্রকার আড়াল হয়ে থাকা রুম্মানাকে ইকবাল আমার সামনে এনে পরিচয় করিয়ে দিলো। রুম্মানাকে দেখে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুটা হকচকিত হয়ে গেলাম। ইকবালের কাছ থেকে শুনে রুম্মানার গম্ভীর ধরনের একটি চেহারা আমার মানসপটে ভেসে উঠত! কিন্তু এখন আমি দেখলাম-তার দু’চোখের যে জ্যোতি খেলে যাচ্ছে, মনে হয় ফেনী নদীর উত্তাল ঢেউ! সে ঢেউয়ে বারবার দোলা খাচ্ছে তাদের সুখী জীবনের প্রতিচ্ছবি।
রুম্মানা আর ইকবালের বিয়ের কিছু দিন গড়ানোর পর তাদের সম্পর্কের মধ্যে যে ফাটল দেখা দিয়েছিল, ঘটনাটি তার কিছু দিন পরের। আমার কথামতো ইকবাল তার বিবাহিত অনেক আত্মীয়-স্বজনের সাথে রুম্মানার পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের সংসার জীবনের গল্প শুনতে চাইল!
এরকম করে করে তারা প্রতিদিনই বের হয় মানুষের সংসারের গল্প শুনতে। একটি সংসার জীবনের গল্প যে কত রকম অপ্রত্যাশিত আর কত রকম বেদনাবিধুর হয়-সেবারই প্রথম রুম্মানা বুঝতে পারে। রুম্মানা সেদিনই ইকবালের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করে। মানুষের সংসারের গল্প তার সংসারকে যেন বাঁচিয়ে রাখার আশ্বাস দিয়ে যায়!
ইকবালের দু’পাশে তখন তাদের দু’টি ছেলেমেয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করছে। রুম্মানা এক ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা লজ্জা ও সঙ্কোচের স্বরে বলে উঠল-
ভাইজান, আপনি আমাকে সংসারের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আপনাকে কৃতজ্ঞতা।
রুম্মানার এ কথা শুনে মুহূর্তের জন্য আমার গা যেন অবশ হয়ে এলো। মনে হলো আমার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে! ইকবাল আমাকে ফের জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল-
তুই কেমন আছিস রে?
আমার পরামর্শ কিংবা কথায় ইকবালের সোনার সংসার টিকে গেলেও আমার যে তা সম্ভব হয়নি, বা সেই চপলা মায়াবতী বউটা আমার মতো অচ্ছুতের কাছ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল-আর এ শূন্যতা আমাকে দেশ, সংসার, আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে এ দূরের মরুদেশে নিয়ে এলো-আমি তা বলতে গিয়েও বলিনি!
কেবল ফিসফিস করে এতটুকুই বললাম-
খুব ভালো রে।
আমার হৃদয়ে তখন ইকবাল আর রুম্মানার সংসারের প্রতি এমন ঈর্ষা হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমি চিৎকার দিয়ে বলে ওঠি-আমার কথায় কারো সম্পর্ক টিকে গেলে, আমারটা কেন খোয়া গেল? আদতে আমি তা করি না। শিশুর লজেন্স গেলার মতো, চুপচাপ এটিও-এ কথাটিও আমি গিলে ফেলি।



