ট্রাম্প-শির পারস্পরিক অজ্ঞতার দুই বৃত্ত

Printed Edition

মাসুম খলিলী

যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স ব্যতিক্রমী একটি মূল্যায়ন করেছে ট্রাম্প ও শিকে নিয়ে। এতে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সম্পর্ককে সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বাণিজ্য-যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েনের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ আমাদের একটি গভীরতর বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়- এই সম্পর্ক কেবল শক্তির লড়াই নয়; এটি অজ্ঞতার লড়াইও। দুই নেতারই নিজ নিজ প্রভাব বলয় আছে, কিন্তু একই সাথে আছে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের বৃত্ত- একটি ‘স্ফিয়ার অব ইগনোরেন্স’।

বেইজিংয়ে দুজনের শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্যসূচি আপাতদৃষ্টিতে পরিষ্কার। ইরান, সয়াবিন, বোয়িং বিমান, শুল্কনীতি, বিরল খনিজ, চিপ প্রযুক্তি, তাইওয়ান-এসবই পরিচিত ইস্যু। এগুলো নিয়েই আলোচনা হবে, দরকষাকষি হবে এবং সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত খোঁজা হবে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো, দুই প সত্যিই একে অপরের প্রয়োজন ও অভ্যন্তরীণ চাপ কতটা বোঝে?

ট্রাম্প হয়তো জানেন চীন শুল্ক হ্রাস চায়, বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা চায়, প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা ছাড় চায়। কিন্তু তিনি কি বোঝেন, বেইজিংয়ের জন্য তাইওয়ান কেবল একটি ভূখণ্ড নয়- এটি ইতিহাস, পরিচয় ও ‘শতাব্দীর অপমান’-এর প্রতীক? চীনের ভাষায় তাইওয়ান ‘রেড লাইন’- যা অতিক্রম করা যাবে না। আবার শি হয়তো জানেন যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব রয়েছে, কিন্তু তিনি কি বোঝেন যে আমেরিকান ভোটারদের জন্য মূল্যস্ফীতি, ব্যক্তিগত অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই মূল উদ্বেগ- বৈদেশিক নীতি নয়?

আমেরিকায় সাম্প্রতিক জনমত জরিপ দেখাচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষ অর্থনৈতিক ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেয়। শুল্কনীতি নিয়ে জনমতও স্পষ্ট : বড় অংশ মনে করে এটি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তৃতায় কঠোরতা থাকলেও ভোটারের মনোযোগ ঘুরে থাকে বাজারের দামে। ট্রাম্প যদি বাণিজ্যযুদ্ধকে শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখেন, ভোটাররা সেটিকে দেখেন পকেটের প্রশ্ন হিসেবে।

অন্য দিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। চীনের রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, অভ্যন্তরীণ মতামত সরাসরি শোনা কঠিন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল হলেও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত। কঠোর সাইবার-নিয়ন্ত্রণ এবং সম্প্রসারিত নিরাপত্তা আইন প্রোপটে বাস্তব জনমত কতটা প্রতিফলিত হয়- তা প্রশ্নসাপে। অথচ একটি দেশের নেতৃত্বের জন্য অভ্যন্তরীণ সামাজিক চাপ বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির দিক থেকেও বাস্তবতা জটিল। চীনে জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হলেও খুচরা বিক্রি ধীর, রিয়েল এস্টেট খাতে পতন এবং বাণিজ্য খাতে চাপ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ‘বৃদ্ধি’ থাকলেও তার গুণগত দিক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শির সামনে তাই দ্বৈত ল্য- অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় মর্যাদা বজায় রাখা। কিন্তু তথ্য-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জনঅসন্তোষের প্রকৃত মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের েেত্রও অজ্ঞতা অন্যরকম। ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রবল। একজন প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক নীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরীায় রূপান্তরিত করতে পারেন, কিন্তু তিনি এককভাবে পুরো জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন না। তাই শি যদি ট্রাম্পকে ‘আমেরিকা’ হিসেবে ধরে নেন, তবে সেটিও একধরনের ভুল পাঠ। যুক্তরাষ্ট্রে মতা বিকেন্দ্রীভূত; আদালত, কংগ্রেস, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নীতি নির্ধারণে প্রভাব রাখে। ফলে এক ব্যক্তির অবস্থানই শেষ কথা নয়।

এই দুই দেশের মধ্যে মানবিক সংযোগও কমে এসেছে- ছাত্র বিনিময় হ্রাস পেয়েছে, সরাসরি ফাইট কমেছে, বিদেশী সাংবাদিকদের উপস্থিতি সীমিত। যখন শিার্থী, গবেষক ও সাংবাদিকদের সংখ্যা কমে যায়, তখন পারস্পরিক বোঝাপড়া স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়। তথ্যের বদলে ধারণা ও সন্দেহ বাড়ে। ফলাফল-অন্য প সম্পর্কে কল্পিত ধারণা বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়।

এ ছাড়া এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট হয়। উভয় দেশই শক্তিশালী, কিন্তু উভয়ই নিজেদের সমাজের জটিলতা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। ট্রাম্প হয়তো চীনের অর্থনৈতিক চাহিদা বোঝেন, কিন্তু চীনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি বা জাতীয় আত্মপরিচয়ের গভীরতা পুরোপুরি অনুধাবন নাও করতে পারেন। শি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সমতা বা কৌশলগত উদ্বেগ জানেন, কিন্তু আমেরিকান ভোটারদের প্রতিক্রিয়াশীল প্রকৃতি ও নীতিগত বৈচিত্র্য পুরোপুরি ধরতে পারেন না।

এই বাস্তবতা সম্মেলনের ফলাফলকে সীমিত করে দেয়। আলোচনার মাধ্যমে কিছু অগ্রগতি হতে পারে- বাণিজ্যিক সমঝোতা, শুল্ক-সমন্বয়, কৃষিপণ্য ক্রয় বা কূটনৈতিক ভাষায় নমনীয়তা। কিন্তু মূল অজ্ঞতার বৃত্ত ভাঙা সহজ নয়। কারণ এটি কেবল তথ্যের অভাব নয়; এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।

তবুও কূটনীতি অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং অজ্ঞতার যুগে কূটনীতি আরো গুরুত্বপূর্ণ। যদি দুই নেতা অন্তত একে অপরের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন- যেকোনো সিদ্ধান্তই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও জনমতের চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে-তবে সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। সম্মেলনকে তাই বিজয়-পরাজয়ের ভাষায় নয়, বরং বোঝাপড়ার সূচক হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত।

বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো- যখন শক্তি আছে, কিন্তু বোঝাপড়া নেই। ট্রাম্প ও শির সম্পর্ক সেই পরীার মুখোমুখি। পরিচিত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হবে ঠিকই, কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে অজানার ভেতরে।

অতএব এই সম্মেলনের গুরুত্ব কেবল চুক্তির খসড়ায় নয়; বরং পারস্পরিক সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতিতে। যদি উভয় প একে অপরের জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সম্পর্কে আরো সচেতন হয়, তবে সেটিই হবে বড় অর্জন। কারণ বিকল্প পথটি-অজ্ঞতার ভিত্তিতে ভুল সিদ্ধান্ত যা বিশ্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় কূটনীতি কেবল সমঝোতার প্রক্রিয়া নয়; এটি ভুল বোঝাবুঝি কমানোর শিল্প। ট্রাম্প ও শির “স্ফিয়ার অব ইগনোরেন্স” ছোট না হলে সংঘাতের সম্ভাবনা বড় হতে পারে। তাই সম্মেলনের আসল পরীা হলো- দুই নেতা কি একে অপরকে সত্যিই শুনতে প্রস্তুত?