গুম কমিশন বাতিলে নতুন আতঙ্কে স্বজনহারা পরিবার

দ্রুত নতুন আইনি কাঠামো তৈরির তাগিদ

নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে প্রিয়জনকে তুলে নেয়ার পর যেমন ভয়-ভীতি, হুমকি-ধামকি আর নজরদারির মধ্যে দিন কাটাতে হতো, ঠিক তেমনি গুম সংক্রান্ত কমিশন বাতিল হওয়ায় অজানা শঙ্কা আবারো তাড়া করে ফিরছে তাদের।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে প্রিয়জনকে তুলে নেয়ার পর যেমন ভয়-ভীতি, হুমকি-ধামকি আর নজরদারির মধ্যে দিন কাটাতে হতো, ঠিক তেমনি গুম সংক্রান্ত কমিশন বাতিল হওয়ায় অজানা শঙ্কা আবারো তাড়া করে ফিরছে তাদের।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এক দিকে স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা, অন্য দিকে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে বছরের পর বছর নামে-বেনামে হুমকি দেয়া হয়েছে। কান্না পর্যন্ত চেপে রাখতে হয়েছে ভয় থেকে। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে সাহস করে তারা গুম সংক্রান্ত কমিশনের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা, তথ্য ও অভিযোগ তুলে ধরেছিলেন। বিচার পাওয়ার আশ্বাসে তারা প্রকাশ করেছিলেন জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতিগুলো। অথচ এখন সেই কমিশনই আর কার্যকর নেই। তাদের অভিযোগ, গুমের সাথে জড়িত হিসেবে যেসব কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে, তাদের অনেকেই এখনো সরকারি চাকরিতে বহাল রয়েছেন। কেউ কেউ শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি হয়েছেন। ফলে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা।

গুম সংক্রান্ত কমিশন গঠন থেকে কার্যকারিতা হারানো : ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের গুম সংক্রান্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি মো: ফরিদ আহমেদ শিবলী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাবিলা ইদ্রিস এবং মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন। কমিশনের দায়িত্ব ছিল ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কতজন গুম হয়েছেন বা আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হয়েছেন, সেই ঘটনাগুলোর অনুসন্ধান করা।

কমিশন গঠনের পর সদস্যরা সরাসরি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। প্রথমদিকে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই মুখ খুলতে চাননি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস পেয়ে ধীরে ধীরে সাহস পান ভুক্তভোগীরা। একের পর এক উঠে আসতে থাকে গুম, নির্যাতন ও গোপনে আটকে রাখার ভয়াবহ বর্ণনা। ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্য, নথি ও বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে কমিশন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় আলোচনায় আসে কথিত ‘আয়নাঘর’-এর অস্তিত্ব। বিভিন্ন স্থানে গোপন আটককেন্দ্র, নির্যাতনের চিহ্ন এবং ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা আলামত পাওয়ার দাবি করে কমিশন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। গত ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বসার পর ৩০ দিনের মধ্যে জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারায়। বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির অনুমোদন দেয়া হয়নি। এর মধ্যে গুম সংক্রান্ত কমিশন অধ্যাদেশও ছিল। ফলে কমিশনের আইনি কার্যকারিতা বাতিল হয়ে যায়।

১২ বছর শুধু ভয় নিয়েই বেঁচে আছি : ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর টঙ্গী থেকে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ফারুক হোসেন টিটুর স্ত্রী মোর্শেদা বলেন, স্বামী গুম হওয়ার পর পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু সহযোগিতা দূরের কথা, উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, তিন সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন মনে হতো এই বুঝি আমার সন্তানদের তুলে নিয়ে যাবে, এই বুঝি আমাকেও গুম করে দেবে। ১২ বছর ধরে বিভিন্ন দফতরে ঘুরেও কোনো বিচার পাইনি।

তিনি আরো বলেন, ‘সব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে গুম কমিশনের কাছে আমরা সব তথ্য দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল অন্তত বিচার পাবো। কিন্তু এখন সেই কমিশনই নেই। অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা এখনো চাকরিতে বহাল। তাদের বিচার না হলে আমরা কখনো নিরাপদ হবো না।

অভিযোগ দিয়েই যেন নতুন বিপদ ডেকে এনেছি : ২০১৩ সালের ১৭ মে মিরপুর থেকে গুম হওয়া কুদ্দুসুর রহমানের মেয়ে অভিযোগ করেন, তৎকালীন র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তার বাবাকে গুম করা হয়। তিনি বলেন, শুধু বাবাকে গুম করেই তারা থামেনি। আমাদের পুরো পরিবারকে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। বিচারের জন্য কোথাও যেন না যাই, সে জন্য নিয়মিত হুমকি দেয়া হতো। উড়ো চিঠি, মোবাইল মেসেজ সবকিছুই ছিল ভয় দেখানোর অংশ। তার দাবি, গুম কমিশনে অভিযোগ দেয়ার পরও তাদের হুমকি দেয়া হয়েছিল এবং বিষয়টি কমিশনকে জানানো হয়েছিল। এখন কমিশনই নেই। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে। মনে হচ্ছে বিচার চাইতে গিয়ে নতুন করে বিপদ ডেকে এনেছি।

নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পদ নিয়েও অনিশ্চয়তা : ইনশা নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, গুমের ঘটনা শুধু একজন মানুষকে হারানোর বেদনা নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ। আয় করার কেউ নেই। অথচ তার ব্যাংকে টাকা থাকতে উত্তোলন করা যাচ্ছে না, সম্পদ থাকার পরও তার স্ত্রী সন্তান সে গুলো বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছে না। কারণ তিনি মৃত না জীবিত, সেটাই নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম গুম কমিশন শুধু বিচার নয়, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্পদ ও পরিবারের আইনি সুরক্ষার বিষয়েও উদ্যোগ নেবে। কিন্তু কমিশন বাতিল হওয়ায় সেই আশাও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নতুন আইনি কাঠামো প্রয়োজন : এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুম-সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদে অনুমোদনের মাধ্যমে কমিশনের কাঠামো ও কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব ছিল। ভুক্তভোগীদের শঙ্কার বিষয়টা আমরা বুঝতে পারি। তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করবো সরকার দ্রুত নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করবে। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রয়োজন হলে আমরা সহযোগিতা করবো।