সংসদ প্রতিবেদক
গণভোট সংস্কার প্রস্তাব, সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধ ও উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট, অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরল মুলতবি প্রস্তাব- সব মিলিয়ে সংসদে রাজনৈতিক টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে সংসদের অধিবেশন চলাকালে গণভোট সংস্কার প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট পরিষদ গঠন বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না আসায় বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদস্বরূপ অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা যে এজেন্ডা উত্থাপন করেছি, তা ছিল গণভোট এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।’
তিনি আরো বলেন, আলোচনায় একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হলেও, সেই প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার বিশেষ কমিটি এবং সেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হলে তা কার্যকর হতে পারত।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, এই ইস্যুটি জনগণের প্রত্যাশার সাথে সম্পর্কিত। ‘প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের প্রতিফলন এখানে জড়িত। কিন্তু তার মূল্যায়ন হয়নি,’-বলেন তিনি।
স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন, আগের দিনের প্রস্তাবটি ছিল একটি মুলতবি প্রস্তাব এবং সংসদীয় ইতিহাসে এমন প্রস্তাব খুবই বিরল। তিনি বিরোধী দলকে ধৈর্য ধরে পরবর্তী নোটিশ শোনার আহ্বান জানান।
তবে বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে। ডা: শফিকুর রহমান দাবি করেন, নতুন নোটিশ মূল প্রস্তাবকে আড়াল করার জন্য আনা হয়েছে। এর প্রতিবাদেই তারা ওয়াকআউট করেন।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংসদীয় সংস্কৃতিতে ওয়াকআউট স্বাভাবিক হলেও আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারি দলের মুলতবি প্রস্তাব : একই অধিবেশনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যা সংসদীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ ধারায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে তিনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ : ভবিষ্যতের পথরেখা’কে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে উল্লেখ করে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান জানান।
প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর স্পিকার জানান, কার্যপ্রণালী বিধির ৬৫(২) অনুযায়ী আগামী ৫ এপ্রিল সংসদের অধিবেশনে দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে এই প্রস্তাবের ওপর অনধিক দুই ঘণ্টা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
এ সময় স্পিকার একটি ঐতিহাসিক দিক তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের ৫৩ বছরের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দলের কোনো সদস্য মুলতবি প্রস্তাব এনেছেন।
বিরোধী দলের সংবাদ সম্মেলন
এ দিকে, ওয়াকআউট পরবর্তীতে সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধানে ‘সংস্কার’-এর পক্ষে গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করে সরকার নিছক ‘সংশোধন’-এর প্রস্তাব দেয়ায় এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি। জনগণের ম্যান্ডেটকে অপমান করা হয়েছে অভিযোগ করে জনমত নিয়ে ফের রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দেন তিনি।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে, সংশোধনের জন্য নয়। কিন্তু সরকার জনগণের সেই চূড়ান্ত রায়কে বেমালুম অগ্রাহ্য করে অপমান করেছে। এর প্রতিবাদেই আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি।’
বিরোধীদলীয় নেতা জানান, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের রায় অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সাথে সংসদ সদস্য এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী তাদের দুটি শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করার কথা থাকলেও সরকার তা করেনি। বাধ্য হয়ে আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে নোটিশ দিই। শেষ পর্যন্ত গত মঙ্গলবার আলোচনার সুযোগ দেয়া হলে আইনমন্ত্রী জনগণের সংস্কারের দাবিকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। আমরা তখনই বলেছি, সংস্কার আর সংশোধন এক জিনিস নয়। সরকার জনগণের ইচ্ছার সাথে প্রতারণা করছে।’
এ সময় বিগত সরকারের সমালোচনা করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিগত সাড়ে ১৫ বছরে জনগণের ওপর যে ফ্যাসিবাদ চাপানো হয়েছিল, বিনা বিচারে ২৬৬৩ জন মানুষকে খুন করা হয়েছে। গুম হয়েছেন ২৫০ জনের বেশি মানুষ, যাদের খোঁজ আজও মেলেনি। আয়নাঘরের মতো ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করে মানুষকে ৮-৯ বছর বন্দী রাখা হয়েছে। সেই অমানবিক ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান এবং সংবিধান সংস্কারের এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।’
ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়েই আমরা ওয়াকআউট করেছি। তবে আমরা সংসদ ছেড়ে দিইনি (গিভ আপ করিনি)। আমরা এখন আবার সেই জনগণের কাছেই ফিরে যাব। আমাদের ১১টি দলের জোট দ্রুতই একত্রে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে। জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।’
সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে একই দিনে বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং সরকারি দলের মুলতবি প্রস্তাব দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দ্বিমুখী চিত্রে তুলে ধরেছে।
একদিকে বিরোধী দল গণভোট ও সংস্কার পরিষদ নিয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দাবি করছে, অন্যদিকে সরকার সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণে অগ্রসর হতে চাইছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই প্রবণতার মধ্যে সমন্বয় না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরো গভীর হতে পারে। তবে ৫ এপ্রিলের নির্ধারিত আলোচনা ভবিষ্যৎ সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।



