ঈদ-পরবর্তী পুঁজিবাজার আচরণে বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি

বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণার পরবর্তী রেকর্ড শেষ হওয়ার পর লেনদেনে কিছুটা পিছিয়ে পড়া খাতটিতে আবার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফিরতে দেখা যায়

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে মিল রেখেই পুঁজিবাজারে ঈদপরবর্তী প্রথম কার্যদিবসটি পার হলো। গতকাল ১ জুন দীর্ঘ ছুটির পর নতুন কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেন ও সূচক। বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়া সাবলীল এ বাজার আচরণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এনে দিয়েছে স্বস্তি। তারা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে ঈদের ছুটি পরবর্তী লেনদেনে তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। আর এটিকে সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তারা।

গতকাল শুরু থেকেই লেনদেনের বেশ গতি ছিল পুঁজিবাজারে। লেনদেনের এই গতি হঠাৎ করে ব্যাংকিং খাতকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণার পরবর্তী রেকর্ড শেষ হওয়ার পর লেনদেনে কিছুটা পিছিয়ে পড়া খাতটিতে গতকাল আবার বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফিরতে দেখা যায়। এতে একদিকে লেনদেন যেমন গতি ফিরে পায় তেমনি তার প্রতিফলন ঘটে সূচকে। দুই পুঁজিবাজারেই প্রথম ঘণ্টাটি কাটে সূচকের উন্নতিতে। পরবর্তীতে সাময়িক বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলেও দ্রুত তা সামলে নেয় বাজারগুলো। এতে দিনশেষে উভয় বাজারই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৬ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৭২ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে। লেনদেন শুরুর পৌনে ১ ঘণ্টায় ডিএসইর এই সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩৮০ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি ঘটে ৪৫ পয়েন্টের বেশি। সূচকের এ অবস্থান থেকে কিছুটা বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সাময়িকভাবে নি¤œমুখী হয় সূচকটি। সকাল সোয়া ১১টার দিকে সূচকটি ৫ হাজার ৩৬৪ পয়েন্টের ঘরে নামলেও থেমে যায় পতন। পরবর্তীতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বাজারটি ৩০ পয়েন্টের বেশি উন্নতি ধরে রাখে সূচকটি। বেলা ১টার পর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হলে দিনশেষে প্রায় ৩৭ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয়- যথাক্রমে ১৩ দশমিক ৭০ ও ৪ দশমিক ০২ পয়েন্ট।

অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৭৯ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৫৩ দশমিক ২২ ও ৫৩ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে। ডিএসই গতকাল ৯১২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা ঈদ পূর্ব শেষদিনের লেনদেনের চেয়ে ১১২ কোটি টাকা বেশি। গত ২৪ মে ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৭৮ কোটি টাকা। লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে চট্টগ্রাম বাজারেও। সিএসই গতকাল ৪৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা, আগের দিন অপেক্ষা ২৬ কোটি টাকা বেশি। ঈদ-পূর্ব শেষ কর্মদিবসে বাজারটির লেনদেন ছিল ২১ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্প্রতি বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করেছে। ঈদের আগেই বাজারগুলোতে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতা ছিল গতকালও। দেশে এ মুহূর্তে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের খুব একটা সুযোগ নেই। তাই কিছুটা ঝুঁকি নিতে হলেও মানুষ চায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে। কিন্তু গত এক যুগেরও বেশি সময় টানা মন্দায় আটকে থাকা পুঁজিবাজারে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন করে কিছু মানুষ আবার বাজারমুখী হচ্ছেন। বাড়ছে বিও হিসাব। সরকারও এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীও বিভিন্ন বক্তব্যে পুঁজিবাজার নিয়ে তার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এবার সৃষ্টি হয় নতুন উদ্দীপনা। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এ ব্যাপারে মনযোগ দিলে অবশ্যই সামনের দিনগুলোতে একটি ভালো ও গতিশীল পুঁজিবাজার আশা করতে পারেন বিনিয়োগকারীরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি এনসিসি ব্যাংক। ৪৪ কোটি ৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির দুই কোটি ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৮ কোটি ১৭ লাখ টাকায় ৪১ লাখ ২৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিবিএস ক্যাবলস, সিটি ব্যাংক, গোল্ডেন সন, যমুনা ব্যাংক, আর ডি ফুডস, নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস ও বিডি থাই ফুডস।

গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের সোনারগাঁও টেক্সটাইলস। গতকাল কোম্পানিটির ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল গোল্ডেন সন। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেড, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, এনসিসিবি, সিকদার ইন্স্যুরেন্স ও গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ।

ডিএসইতে দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার লিজিং। গতকাল ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের ইউনিয়ন ক্যাপিটাল। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, অ্যাপোলো ইস্পাত, এফএএস ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ফনিক্স ফিন্যান্স, এপেক্স ট্যানারি, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ও রহিমা ফুড করপোরেশন।