মো: আবদুর রহমান
রাগ বা ক্রোধ মানুষের মন্দ স্বভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম। রাগ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রত্যেক মানুষেরই রাগ আছে। তবে কারো কম আর কারো বেশি। রাগ হলো অন্তরের অগ্নিশিখা, যা মানুষের শরীর ও মনে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তাই রাগ মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এতে ব্যক্তি ধর্মীয়ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেননা, অনেক সময় রাগের কারণে স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পাওয়ায় অনেকে গর্হিত ও অন্যায় কাজ করে ফেলে, যা শরিয়তে নিষেধ। তাই মানুষের মনে রাগ এলে তা সংবরণ করার চেষ্টা করা আবশ্যক, যাতে মানুষ গর্হিত ও অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। মূলত রাগ সংবরণ করা আদর্শ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
রাগ সংবরণের গুরুত্ব : রাগ মানুষের সহজাত একটি প্রবৃত্তি। রাগ অনিয়ন্ত্রিত হওয়া মানবীয় গুণের বিপরীত। আর আল্লাহ তায়ালাও নিয়ন্ত্রণহীন রাগী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। তাই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করাই কাম্য। রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো- রাগ দমিয়ে রাখা, পেটের মধ্যে চেপে রাখা এবং তা প্রকাশ ও বাস্তবায়ন না করা। আল্লাহ তায়ালা রাগ নিয়ন্ত্রণকারীদের ভালোবাসেন। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে এবং যারা রাগ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান-১৩৪) অনেক সময় রাগী ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। রাগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাগ হলো ধ্বংসকারী ও বিবেক-বুদ্ধি বিনাশকারী। যখন রাগ আসে তখনই অবক্ষয় বিস্তার লাভ করে। যার কারণে অনায়াসে মুখে অশ্লীল কথা ও অঙ্গে অশ্লীল কাজ প্রকাশ পায়। রাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ, বিচ্ছেদ, আত্মীয়ের সাথে শত্রুতা, বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
মা-বাবা রাগী হলে সন্তানরা ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে বড় হয়। এটি তাদের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া রাগ কথাকে এলোমেলো, দলিলকে অকার্যকর, মেধাকে বিক্ষিপ্ত, বিবেককে আচ্ছাদিত এবং দুনিয়া ও আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়। ক্রোধ যার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তার চেহারা বিবর্ণ হয়। যখন রাগ এসে পড়ে তখন ফেতনা চক্কর দেয়, শয়তান উপস্থিত হয় এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, ভালোবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।
যে ব্যক্তি রাগের আনুগত্য করে, সে তার আদবকে নষ্ট করে। দ্রুত রাগান্বিত হওয়া স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বৈশিষ্ট্য। এমন মানুষ যখন রেগে যায়, তখন সে বাজে কথা বলে, আঘাত করে, তার সাথে কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়, কোনো বিষয়ে আলোচনা করলে জ্বলে উঠে আর বিরোধিতা করলে অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। এটি তার অজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতার প্রমাণ। এগুলো প্রত্যেক রাগী, মূর্খ ও হঠকারীর বৈশিষ্ট্য।
রাগ বা ক্রোধ ঈমানের বড় শত্রু। রাগ করলে মানুষের ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা: বলেছেন, ‘ক্রোধ বা রাগ মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয়, যেমনিভাবে তিক্ত ফল মধুকে নষ্ট করে দেয়।’ (বায়হাকি, মিশকাত)
রাগের বশবর্তী হয়ে কাউকে ক্ষতি বা আঘাত করা প্রকৃত বীরের কাজ নয়; বরং প্রকৃত বীরের কাজ হলো রাগকে সংবরণ করে ক্ষমা করে দেয়া। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়; বরং সেই প্রকৃত বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (বুখারি-৮০৯) যে ব্যক্তি ক্রোধের দাবানল প্রজ্জ্বলিত হওয়ার পর সহনশীলতার মাধ্যমে তা দমন, ধৈর্যের মাধ্যমে পরাজিত এবং অবিচলতার মাধ্যমে পরাভূত করল, সে তার সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু এবং মন্দ প্রতিপক্ষকে দমন করল।
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- এক ব্যক্তি রাসূল সা:-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অল্প কথায় কিছু উপদেশ দিন। রাসূল সা: বললেন, ‘তুমি রাগ করো না’। লোকটি কয়েকবার একই কথা বললেন। রাসূল সা: প্রত্যেকবারই বললেন, ‘তুমি রাগ করো না’। (বুখারি-৬১১৬)
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, লোকটি বলেন, আমি রাসূল সা:-এর কথাটি নিয়ে চিন্তা করে দেখলাম, রাগ সব অকল্যাণের মূল। হজরত ইবনে আবদুল বার রহ. বলেন, ‘যে রাগকে সংবরণ ও প্রতিহত করবে, সে শয়তানকে লাঞ্ছিত করবে এবং তার ব্যক্তিত্ব ও দ্বীন নিরাপদ থাকবে।’ ইবনুল মোবারক রহ.-কে বলা হলো, এক কথায় আমাদের উত্তম চরিত্রের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, ‘রাগ পরিহার করা’। যারা সওয়াবের আশায় রাগের সময় ক্ষমা ও ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন।
পবিত্র কুরআনে রাগ সংবরণকারীর জন্য বর্ণিত হয়েছে মহা সুসংবাদ! আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘অতএব তোমাদের যা কিছু দেয়া হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগমাত্র। আল্লাহর কাছে যা আছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের পালনকর্তার ওপর ভরসা করে। আর যারা বড় গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয়, তখন ক্ষমা করে দেয়।’ (সূরা শুরা : ৩৬-৩৭) এক হাদিসে রাগ সংবরণকারীর জন্য জান্নাতের ঘোষণা দিয়ে রাসূল সা: বলেন, ‘তুমি রাগ করবে না, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত।’ (তিবরানি-২১) রাগ বর্জনকারীকে আল্লাহ তায়ালা অনেক মর্যাদা দান করেন। যুগে যুগে যেসব মহিরুহ মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়েছেন তারা রাগ বর্জন করেছেন। একবার হজরত আবু বকর রা: রাগতস্বরে তার গোলামকে বকাঝকা করছিলেন। তখন রাসূল সা: দেখে বললেন, কাবার কসম, সিদ্দিক হতে চাও, অথচ রাগ করা ও তিরস্কার থেকে বিরত থাকো না- এমনটি কখনো হতে পারে না। সুতরাং কস্মিনকালেও সম্ভব নয় রাগ করে সিদ্দিক হওয়া। কারণ উভয়টি সমান্তরাল হওয়া অসম্ভব। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়ে মানুষের প্রতি রাগ করা শোভা পায় না। রাগকে হজম করতে হয়।
রাগ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি জান্নাতে অভূতপূর্ব পুরস্কারে ভূষিত হবেন। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের রাগ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন সমগ্র সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের যেকোনো হুর নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেয়ার অধিকার দান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ-৪১৮৬) রাসূল সা: আরো বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার রাগ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছুতে নেই।’ (ইবনে মাজাহ-৪১৮৯) সুতরাং একজন মুমিন ও মুসলমান হিসেবে আমাদের অবশ্যই রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা



