বিশেষ সংবাদদাতা
বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ‘প্রগতি স্কিমে’ তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে গতকাল বুধবার সচিবালয়ে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অগ্রগতি এবং ব্যাংক খাতের কর্মীদের প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সভায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: সুরাতুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি খাতে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত শ্রমিক-কর্মী কাজ করলেও তাদের অধিকাংশের জন্য অবসর-পরবর্তী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন সুবিধা পেলেও বেসরকারি খাতের কর্মীরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ বাস্তবতায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় চালু হওয়া ‘প্রগতি স্কিম’ একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি জানান, স্কিমটিকে আরো আকর্ষণীয় করতে শেয়ারভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর সম্ভাবনা, মনোনীত ব্যক্তির জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
সভায় জানানো হয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত প্রগতি স্কিমে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বহন করবে। মাসিক চাঁদার পরিমাণ এক হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবসরের পর আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা, চাঁদায় কর অব্যাহতি, পেনশন আয় করমুক্ত রাখাসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে এ স্কিমে। এ ছাড়া ৬০ বছর পূর্তির পর জমা করা অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে গ্রহণের সুযোগও থাকছে।
সভায় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির সামগ্রিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, গত ৩০ মে পর্যন্ত চারটি পেনশন স্কিমে মোট তিন লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। এ পর্যন্ত জমার পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ২৮৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এ ছাড়া জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এর মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে পেনশন স্কিমের চাঁদা গ্রহণ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। একই সাথে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের প্রতিটিতে অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
সচিব নাজমা মোবারক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রচার ও গ্রাহক বৃদ্ধির জন্য সব শাখায় পৃথক পেনশন ডেস্ক স্থাপন, ব্যানার প্রদর্শন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিপণন কার্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রগতি স্কিমের আওতায় আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট অনেকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার আশায় বিগত হাসিনা সরকার এই স্কিমটি চালু করে। সমতা, সুরক্ষা, প্রগতি ও প্রবাস- এ চারটি স্কিমের মাধ্যমে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
পরে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নতুন করে যুক্ত করা হয় ‘প্রত্যয় স্কিম’। এই স্কিমে শুধু সব স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরিতে যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী চলতি ২০২৪ সালে ১ জুলাই তারিখ ও তৎপরবর্তী সময়ে নতুন যোগদান করবেন, তাদেরকে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে গত আগস্টে পুরো প্রত্যয় স্কিম বাতিল করে দেয়া হয়।
গত ২০২৪ সালের ২ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এই মর্মে জানানো যাচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়, স্ব-শাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থার কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যয় স্কিমসহ সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।’ বর্তমানে এই স্কিমের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।



