এডিপিতে নতুন ২৩ মেগাপ্রকল্প

বাস্তবায়নে লাগবে ৭ লাখ সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • বিদেশী অর্থায়ননির্ভর ১৫ প্রকল্পেই ৫.৪৮ লাখ কোটি টাকা
  • এডিবি, বিশ^ব্যাংক, কোরিয়া, এআইআইবি, আইডিবি, ইইউ থেকে ঋণের প্রত্যাশা

অতীতে নেয়া অনেক মেগা প্রকল্প নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। ধীরগতিতে এগোচ্ছে বাস্তবায়ন কার্যক্রম। কিছু প্রকল্প আংশিক চালু হলেও পুরো কাজ এখনো শেষ হয়নি। আবার কিছু প্রকল্পের মেয়াদ একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে। এরপরও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক ঋণসহায়তা নির্ভরসহ সরকারি অর্থায়নে ২৩টি মেগাপ্রকল্প অননুমোদিত তালিকায় রাখা হয়েছে। আগামী ১০ বছরে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত মোট খরচ ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এখানে বিদেশী অর্থায়নের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ^ব্যাংক, আইডিবি, কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক, এআইআইবি, এলওসি, ইডিসিএফ, ইআইবি, ইউনেস্কোকে রাখা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে মেগা প্রকল্প নেয়া উচিত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ধরনের বড় খরচের এবং বিদেশী ঋণনির্ভর প্রকল্প নেয়া আমাদের মতো অর্থনীতির দেশের জন্য সঠিক হবে না। আমাদের অনেক প্রকল্প এখনো বছরের পর বছর চলমান আছে।

জানা গেছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে একনেক। নতুন এডিপিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্পের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) ৮০টি প্রকল্প এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব রয়েছে।

এখানে জিওবি বা সরকারি অর্থায়নে এবং বিদেশী সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে ২৩টি অননুমোদিত নতুন বড় প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭ লাখ ৭ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৩ লাখ ২১ হাজার টাকা। এর মধ্যে জিওবি অর্থায়নে এক হাজার ৬০টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি মেগাপ্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় এক লাখ ৫৯ হাজার ৭১৯ কোটি ৮৯ লাখ ৬ হাজার টাকা। আর বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে নেয়া ১৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি মেগাপ্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৪৭ হাহার ৭৯৯ কোটি ৮৪ লাখ ২১ হাজার টাকা।

জিওবি অর্থায়নে ৮ মেগাপ্রকল্প

এডিপি দলিলের তথ্য বলছে, সেতু বিভাগ, শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য সেবা খাত এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মেগাপ্রকল্প ৮টি। এখানে সেতু বিভাগের ২টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলো হলো- সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকায় ঢাকা ইষ্ট-ওয়েষ্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে ও সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। পানিসম্পদ খাতে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প।

স্বাস্থ্য খাতে ১৭ হাজার ৫৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। আর শিক্ষা খাতের চারটি প্রকল্পের মধ্যে ১৭ হাজার ৪২ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, ২২ হাজার ১৬৪ কোটি ২০ লাখ ৪৭ হাজার টাকায় জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, ১৪ হাজার ৬১ কোটি ১১ লাখ ৭৬ হাজার টাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উন্নয়ন এবং ১১ হাজার ৭৯৭ কোটি ৭৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিডডে মিল কর্মসূচি।

বিদেশী অর্থায়নে ১৫ মেগা প্রকল্প

বিদেশী অর্থায়ন প্রাপ্তির সুবিধার্থে আগামী এডিপিতে ১৭৭টি অননুমোদিত নতুন প্রকল্প রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি রয়েছে মেগাপ্রকল্প। যেগুলো বাস্তবায়নে বড় ধরনের অর্থের প্রয়োজন হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ^ব্যাংক, আইডিবি, কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক, এআইআইবি, এলওসি, ইডিসিএফ, ইআইবি, ইউনেস্কো থেকে এসব প্রকল্পে অর্থায়নের প্রত্যাশা করছে সরকার। এখানে মেগাপ্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বিদ্যুৎ খাতে ২৫ হাজার ১১৪ কোটি ৭২ লাখ টাকায় মাতারবাড়ি ১২শ’ আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়ন, ৬৩ হাজার ৩৮ কোটি টাকায় সাউথ করিডোর উন্নয়ন, ৫৫ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকায় মেট্রোরেল লাইন্স-২, ৪৭ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকায় মেট্রোরেল লাইন-৫ সাউদার্ন, ৫১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় ৫ম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন।

এ ছাড়াও রয়েছে, হাটিকুমরুল-বনপাড়া-ঝিনাইদহ সড়ক উন্নয়ন, ভাঙা-যশোর-বেনাপোল সড়ক উন্নয়ন, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কের মেঘনা নদীতে সেতু, বরিশাল-ভোলা সড়কে তেতুঁলিয়া নদীতে সেতু, ২য় যমুনা সেতু, রেলের ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত কড লাইন নির্মাণ, লাকসাম-চিনকি আস্তানা-চট্টগ্রাম লাইনে ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাক নির্মাণ, টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া মিটারগেজ ডাবল লাইন পথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন করা এবং হেলথ অ্যান্ড নিউট্রেশন সার্ভিস উন্নয়ন প্রকল্প।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের মত

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা হলে তারা জানান, মন্ত্রণালয়গুলো প্রকল্প দলিল যখন তৈরি করবে তখন যেন তা সঠিকভাবে করে। আর পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন, অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থ বরাদ্দ এবং আধুনিক প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করলে আগামী ১০ বছরে এসব মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পগুলো সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে প্রণয়ন করা হলে বাস্তবায়নে খুব বেশি সমস্যা হবে না।

অর্থনীতিবিদদের অভিমত

এ দিকে এত বেশি মেগাপ্রকল্প নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি নয়া দিগন্তকে মুঠোফোনে বলেন, আমাদেরকে বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই শুধু মেগা প্রকল্প নয়, সব ধরনের প্রকল্প নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে তা থেকে দেশের মানুষ কোনো ধরনের উপকৃত হবে না, এতে অর্থের অপচয় হবে। আর বিদেশীদের থেকে ঋণের কারণে সেখানেও আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।

অতীতের যেসব ভুলভ্রান্তি আছে সেগুলোকে চিহ্নিহ্নত করে সেই আলোকে প্রকল্প নেয়া উচিত। অতীতের বেশ কিছু প্রকল্প আমরা এখনো শেষ করতে পারিনি। এই যে ৫ বছরের প্রকল্প ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে, এটা কেন?

তিনি বলেন, এত বড় আকারের বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অতীতে অনেক বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি সমস্যায় পড়েছে। ফলে নতুন ২৩টি মেগাপ্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে শেষ করতে হলে পরিকল্পনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতা আরো শক্তিশালী করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, এডিপি একটা বড় জায়গা যেখানে সাশ্রয়ী হওয়ার প্রচুর সুযোগ আছে। ৩ লাখ কোটি টাকার এডিটি দিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু দিতে হবে কেন? দিতে হবে এটা আমাকে দেখানোর জন্য। আমি দিয়েছি। বাস্তবায়ন করতে পারলাম কি পারলাম না, ওটা পরে দেখা যাবে। কিন্তু ওই ধরনের পথে হাঁটলে হয় নীতি এবং পুরা বাজেটটাই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। তাই আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রকল্প নেয়া উচিত।