রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থাগুলোয় স্বাধীনতা পরবর্তীতে দক্ষ জনবল ও প্রকৌশলী তৈরি করা হয়নি। ফলে ভাড়া করা এবং বিদেশনির্ভর জনবলেই চলছে এইসব সংস্থা। বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত ৫৫ বছরেও তৈরি হয়নি নিজস্ব সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশ থেকে কেনা ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নির্ণয় ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য এখনো ভাড়া করা ও বিদেশী বিশেষজ্ঞ এবং পরামর্শকদের ওপর নির্ভরশীল সংস্থাটি। এতে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রাসহ বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে। ৩০টি লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন কেনার জন্য প্রতি মাসে পরামর্শক খাতে খরচ ধরা হয়েছে পৌনে ২৯ লাখ টাকা। আর এসব ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার খাতে খরচ হবে ৮২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বলে রেলওয়ের প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে। ভৌত অবকাঠামো বিভাগের পরিবহন উইং বলছে, ক্রয়কৃত লোকোমোটিভ মেইনটেন্যান্সের জন্য রেলওয়ের কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার/টেকনিশিয়ানকে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। আর একটি রিসোর্স পুল তৈরির জন্য দরপত্র দলিলে উন্নত প্রশিক্ষণের সংস্থা রাখা যায়। এতে সংস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রকল্প ব্যয় হ্রাস পাবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে লোকোমোটিভ বহরের স্বল্পতার কারণে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমান লোকোমোটিভের সংখ্যা ২৯৬টি। যেখানে ১৬৮টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ। মেকানিক্যাল কোড এবং ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। বর্তমানে রেলওয়েকে ১১৮টি বা ৭০ শতাংশ মিটারগেজ লোকোমোটিভ দ্বারা ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। এসবের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৬৩টি বা ৩৮ শতাংশ মিটারগেজ লোকোমোটিডের বয়স ৪০ বছর। সেগুলোও এখনো পরিষেবা দিয়ে চলেছে। এই পুরনো লোকোমোটিভগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল এবং নির্ভরযোগ্যতাও খুব কম। বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে সুষ্ঠু ট্রেন পরিচালনা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বর্ধনশীল মালবাহী ও আন্তঃনগর যাত্রীবাহী ট্র্যাফিকের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
অর্থায়ন ও মেয়াদকাল
এর আগেও বিদেশী ঋণে লোকোমোটিভ কেনা হয়েছে। এবার ৩০টি লোকোমোটিভ কিনতে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই হাজার ৮২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এখানে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে এক হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ঋণ এবং বাংলাদেশে সরকারের অর্থায়ন ৮২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত মেয়াদ হলো চলতি বছরের জুলাই থেকে আগামী ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। সাড়ে তিন বছরে ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ করতে হবে।
অতীতে ঋণে ইঞ্জিন কেনার তথ্য
রেলওয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে সরকারি খাতে বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের কারণে পুরাতন লোকোমোটিভগুলো প্রতিস্থাপন করা কষ্টসাধ্য। রেলওয়ে গত পাঁচ বছরে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ করেছে। এখানে এডিবির ঋণের বিপরীতে ১০টি এবং ইডিসিএফ, কোরিয়ার ঋণের বিপরীতে ২০টি ইঞ্জিন কিনেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া এর আগে রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০৪৫ সালের মধ্যে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সমগ্র বাংলাদেশ রেলওয়েকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর বিলম্বিত হওয়ায় ২০৫৫-৬০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়েকে মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করতে হবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
পুরাতন এবং জরাজীর্ণ লোকোমোটিভগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশ এবং সরঞ্জাম কেনা। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অর্জন বা জ্ঞান স্থানান্তর করা। ট্রেন পরিষেবার জন্য আধুনিক, নিরাপদ এবং উন্নত মানের লোকোমোটিভ সরবরাহ করা। যাত্রী সাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন ট্রেন পরিচালনা। বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা বৃদ্ধিকরণ। যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য এবং উন্নত ট্রেন পরিষেবা নিশ্চিতকরণ। যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রে বর্ধিত ট্রাফিক চাহিদা পূরণ।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম
প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনা। চুক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য পরামর্শ পরিষেবা সংগ্রহ, যথা: ড্রয়িং ও ডিজাইন যাচাইকরণ তত্ত্বাবধান, প্রোটোটাইপ চূড়ান্তকরণ ও অনাপত্তি সনদ (ঘঙঈ) প্রদান, উৎপাদন/প্রস্তুতকরণ তত্ত্বাবধান, কমিশনিং, নতুন লোকোমোটিভের টেস্টিং ও ট্রায়াল। লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ। দেশীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি।
খাতভিত্তিক খরচের হিসাব
এখানে প্রতিটি লোকোমোটিভের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা (সিডি-ভ্যাটসহ)। প্রকল্প সমাপ্তির পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য স্পেয়ার পার্টস্ বাবদ ৪৬৯ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকার থোক রাখা হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতায় প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
আর ৯৩ জনমাস মেয়াদে পরামর্শ সেবা বাবদ ২৬ কোটি ৭০ লাখ ২৭ হাজার টাকার ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখানে প্রতি মাসে প্রতিজনে খরচ হবে ২৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা। আর ক্রয়কৃত ৩০টি লোকোমোটিভ পাঁচ বছর মেইনটেন্যান্সের লক্ষ্যে দু’ জন সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগে ব্যয় ৪৯ কোটি ৫৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এখানে প্রতি মাসে খরচ হবে ৮২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
বিদেশে ২৪ জনের ৩৬ মাস প্রশিক্ষণের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৯ কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এখানে প্রতিজনে ব্যয় সাড়ে ২৬ লাখ টাকার বেশি। আর ৩৬০ জনের স্থানীয় প্রশিক্ষণে প্রতিজনে ৮৭ হাজার টাকা হিসেবে তিন কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩০টি লোকোমোটিভ কিনতে খরচ ধরা হয়েছে দুই হাজার ৪৫ কোটি ৯ লাখ ১২ হাজার টাকা। এখানে প্রতিটি লোকোমোটিভে ব্যয় ৬৮ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরাতন ও জরাজীর্ণ লোকোমোটিভগুলোর জ্বালানি খরচ অনেক বেশি। এদের নির্ভরযোগ্যতা ও প্রাপ্যতা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। সার্বিক বিবেচনায়, মিটারগেজ ট্রেনগুলো সময়ানুবর্তিতা ও দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ এমজি লোকোমোটিভগুলোর অবিলম্বে প্রতিস্থাপন অপরিহার্য, অন্যথায় লোকোমোটিভের অভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন চলাচল বিঘিœত হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে
এ ব্যাপারে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় স্পেয়ার পার্টসের ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি, নির্ভরযোগ্য বাজারদর, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির প্রকাশিত দর, অন্যান্য প্রকল্পের তুলনামূলক দরের আলোকে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী স্পেয়ার পার্টস্রে নাম, সংখ্যা, পরিমাণ ও একক দর উল্লেখপূর্বক ব্যয় প্রাক্কলন উল্লেখ নেই। এসব উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। কিছু কিছু খাতের খরচকে বাস্তবসম্মত করতে বলা হয়েছে। এছাড়া পরামর্শকের সম্মানী ও অন্যান্য পুনর্ভরণ ব্যয় প্রকৃত বাজারদর অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রতিটি প্রশিক্ষণের নাম, মেয়াদকাল, সংখ্যা ও ব্যয় প্রাক্কলন উল্লেখসহ প্রশিক্ষণের মোট ব্যয় প্রাক্কলন করতে হবে।



