প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের আড়ালে মানবদেহে ছড়াচ্ছে বিষ

Printed Edition

আবুল কালাম

পরিবেশ সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক সমাধান হিসেবে ‘প্লাস্টিক রিসাইক্লিং’ বা পুনর্ব্যবহারকে দেখা হলেও, বাংলাদেশে তা এখন উল্টো জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের ফলে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক, ডাইঅক্সিন গ্যাস ও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) বাতাস, মাটি ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে মানবদেহে। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ ইকোসিস্টেম ও জাতীয় অর্থনীতি।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত কারখানার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে নিবন্ধিত কিংবা অ্যাসোসিয়েশনের আওতাভুক্ত কারখানার সংখ্যা মাত্র আড়াই হাজার (যার মধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশেই রয়েছে প্রায় দেড় হাজার)। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি কারখানা কোনো রকম নিয়মনীতি বা পরিবেশগত ছাড়পত্রের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ গোপনে পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই কারখানাগুলো দেশে প্রতিদিন উৎপাদিত মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৫০ শতাংশ রিসাইকেল করে থাকে।

ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়াকরণ ও অরক্ষিত শ্রমিক

প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের সাধারণ ধাপগুলো হলো-বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, ধোয়া, কাটা এবং গলানো। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রিসাইক্লিং কারখানাগুলোতে আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা বা পর‌্যাপ্ত প্রযুক্তি না থাকায় বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত পানি সরাসরি খাল, নদী ও নালায় ফেলে দেয়া হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন কারখানার শ্রমিকরা। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তারা সরাসরি বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক গ্যাস এবং দূষিত পানির সংস্পর্শে আসছেন।

অরক্ষিত রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার চক্র : প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ --> সুরক্ষা ছাড়াই বাছাই ও ধোয়া --> খোলা বাতাসে গলানো (বিষাক্ত গ্যাস)--> শ্রমিক ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি

গবেষণার ভয়াবহ তথ্য : রক্ত ও মূত্রে মিলছে সিসা-ক্যাডমিয়াম

২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের ভয়াবহ কিছু চিত্র উঠে এসেছে: পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ইএসডিও) গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক নরম করতে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘থ্যালেট’, ‘বিসফেনল-এ’ এবং ভারী ধাতুর কারণে শ্রমিক ও স্থানীয় শিশুদের হরমোনজনিত সমস্যা ও ক্যান্সারের ঝুঁকি চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জাপানি গবেষকদের যৌথ গবেষণায় ঢাকার প্রধান রিসাইক্লিং হাব (যেমন: মাতুয়াইল ও কামরাঙ্গীরচর)-এর শ্রমিক এবং আশপাশের বাসিন্দাদের মূত্র পরীক্ষা করে উচ্চমাত্রায় ক্যাডমিয়াম ও লেড (সিসা) পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক পোড়ানো বা গলানোর ধোঁয়া থেকে ফুসফুসের ক্রনিক সমস্যা এবং শ্বাসকষ্টের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

গবেষণায় প্রাপ্ত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত পরিসংখ্যান অনুসারে- ৪৭.৩ শতাংশ শ্রমিক তীব্র পিঠের ব্যথায় এবং ২৯.৮ শতাংশ শ্রমিক কাঁধের ব্যথায় ভুগছেন (ভারী বর্জ্য লিফটিং ও দীর্ঘক্ষণ বসার কারণে)। ১৯.১ শতাংশ শ্রমিক দীর্ঘস্থায়ী কাশি এবং ১৪.৫ শতাংশ শ্রমিক তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত (বাতাসে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ধোঁয়ার কারণে)। ১৯.৮ শতাংশ শ্রমিকের ত্বকে তীব্র চুলকানি এবং ১৩.৭ শতাংশ শ্রমিকের শরীরে ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ দেখা গেছে (রাসায়নিকযুক্ত নোংরা বর্জ্য সরাসরি হাত দিয়ে ধরার কারণে)।

গর্ভপাত ও জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি : চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা নারীশ্রমিকদের গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব এবং জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশু জন্ম দেয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সতর্কতা

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং ঢাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব নয়া দিগন্তকে জানান, ‘নিম্নমানের প্লাস্টিক গলানোর সময় ডাইঅক্সিন ও ফিউরানের মতো বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছড়ায়। এ ছাড়া কারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত পানি জলাশয়ে পড়ে মাছ ও জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে সেই বিষ আলটিমেটলি মানুষের শরীরে ঢুকছে। বৃষ্টির পানির সাথে এসব রাসায়নিক মাটির গভীরে প্রবেশ করায় মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হচ্ছে, কৃষির উর্বরতা কমছে এবং ফসলের মধ্যেও বিষাক্ত উপাদান জমা হচ্ছে।’

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: আয়েশা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন- ‘পর‌্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করায় শ্রমিকরা শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ, চোখের সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল পেরিয়ে রক্তে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার ও হরমোনজনিত জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।’

সমাধানে বিশেষজ্ঞদের ৮টি জরুরি পরামর্শ

প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের এই মরণফাঁদ থেকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশরক্ষায় বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে নিম্নলিখিত আটটি পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন:

১. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ: পলিথিন ব্যাগ, ওয়ান-টাইম কাপ-প্লেট ও ক্ষতিকর প্লাস্টিকের ব্যবহার আইন করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

২. পরিবেশবান্ধব বিকল্পের প্রসার : প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ এবং পচনশীল কাগজের সামগ্রীর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।

৩. উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ: বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্তরেই প্লাস্টিক বর্জ্যকে অন্য বর্জ্য থেকে আলাদা করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

৪. সামাজিক সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান: প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে তৃণমূল ও প্রাতিষ্ঠানিক পর‌্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো।

৫. খোলা জায়গায় প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধ: যত্রতত্র বা খোলা বাতাসে প্লাস্টিক পোড়ানো বন্ধে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ ও আইনি নজরদারি নিশ্চিত করা।

৬. আধুনিক রিসাইক্লিং প্রযুক্তির প্রবর্তন: সনাতনপদ্ধতির পরিবর্তে উন্নত, পরিবেশবান্ধব ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৭. বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা (ইটিপি) বাধ্যতামূলক করা: প্রতিটি প্লাস্টিক কারখানায় তরল বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা বা ইটিপি স্থাপন এবং শ্রমিকদের জন্য শতভাগ সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার আইনিভাবে বাধ্য করা।

৮. কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ : প্লাস্টিক উৎপাদন, ব্যবহার এবং রিসাইক্লিং খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা।