জঙ্গল সলিমপুর সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আছে সন্ত্রাসীদের সেটা বুঝিয়ে দেয়া হবে

Printed Edition
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন : পিআইডি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন : পিআইডি

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না হুঁশিয়ার করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আছে, আইনানুগভাবে আছে, রাষ্ট্রে আইনের শাসন কায়েম হবে সেটা বুঝিয়ে দেয়া হবে। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যেসব সন্ত্রাসী দেখিয়েছে, তাদের যথাযথভাবে দমন করা হবে।

মন্ত্রী গতকাল রোববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলনকক্ষে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, সলিমপুর, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরসহ পার্শ্ববর্তী সমগ্র এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে আনা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। সেজন্য এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পরিকল্পিত সরকারি স্থাপনা ও একাডেমি নির্মাণের লক্ষ্যে আজ সব বিভাগীয় প্রধানদের সাথে ম্যাপ পর্যালোচনা করে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের বর্তমান কারাগারটি বায়েজিদ লিঙ্ক রোডের পাশের ওই এলাকায় স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শিগগিরই স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। তিনি আরো বলেন, কারা অধিদফতর প্রথমে কারাগারের নির্ধারিত স্থানটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরবর্তী উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি। অন্যান্য সরকারি দফতরের জন্য কোন স্থানে কী স্থাপনা করা হবে, তাও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও যৌথ অভিযান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে কেবল প্রচলিত ধারার পুলিশিং নয়, বরং র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব বাহিনী হেলিকপ্টার সাপোর্টের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের মতো রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালীসহ সব অঞ্চলের সন্ত্রাসীদের তালিকা ও আস্তানা চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্মূল করা হবে। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলাকারী ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না এবং তাদের সর্বশেষ আস্তানাও গুঁড়িয়ে দেয়া হবে।

মন্ত্রী এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন, দেশের কল্যাণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমকর্মীদের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

উচ্চপর্যায়ের এই বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম জেলার সংসদ সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, আইজিপি মো: আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো: মোতাহার হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো: জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো: মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো: শওকত আলী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো: মাসুদ আলমসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তায় জঙ্গলসলিমপুর পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি অথবা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন যাই বলি না কেন; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মধ্যে দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। সেটার একটা নমুনা হচ্ছে জঙ্গল সলিমপুর। ৯ মার্চ এই এলাকায় ব্যাপক পরিসরে একটা যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তবে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারিনি কোনো না কোনো কারণে তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়াতে। কিন্তু আমরা অবাক হয়ে গেলাম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করার মতো দুঃসাহস কিভাবে হলো? তারা রাস্তা কেটে, ভেকু নিয়ে এসে, বুলডোজার নিয়ে এসে র‌্যাবের আন্ডার কনস্ট্রাকশন ক্যাম্প ভেঙে দেয়ার সাহসটা কোত্থেকে পেল? তাদের সাথে কারা জড়িত? এই জায়গার জমি দখলের সাথে কারা জড়িত? এগুলো আমরা এখন ফাইন্ড আউট করছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের আশপাশে বেতুয়া ও চা-বাগান নামে দু’টি পাহাড়ি এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায়ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনার তথ্য পেয়েছে সরকার। ফলে শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, আশপাশের এলাকা থেকেও সন্ত্রাসীদের উচ্ছেদ করা হবে।

বিদ্যমান জুয়া আইন দিয়ে বর্তমান সময়ের অনলাইননির্ভর ও আধুনিক পদ্ধতির জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার চেষ্টা করা হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। বর্তমানে বহু মাদক মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন রয়েছে। কিশোর গ্যাং দমনে আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং তারা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন সংস্কার করা হবে।

প্রসঙ্গত: গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন র‌্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। সেই ঘটনার পর গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের একটি যৌথ অভিযানে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন এবং আলীনগরে একটি অস্থায়ী যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সর্বশেষ গত ২৪ মে দিবাগত গভীর রাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের নেতৃত্বে কয়েক শ সশস্ত্র অপরাধী ভারী বুলডোজার নিয়ে সেই যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পথ রুদ্ধ করতে ভেতরের সড়ক কেটে বড় বড় গর্ত করে রাখে। প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপক গুলিবিনিময়ের পর হামলাকারীরা পাহাড়ের গভীরে পালিয়ে যায়।