নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৩ সালে ঢাকার গুলশানে অফিস নিয়ে ‘তার্কিশডক’ নামে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে। সেখানকার বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন নুরুজ্জামান রাজু। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে রাজু একই স্থানে অফিস খুলে কার্যক্রম চালাতে থাকেন। আসল প্রতিষ্ঠানের হুবহু নকল ‘তার্কিশডকবিডি’ নামে ওয়েবসাইট খুলে শুরু করেন প্রতারণা। সেই থেকে রাজু চক্র বিপুল সংখ্যক রোগীকে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য তুরস্কে পাঠিয়ে জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে আসছিল।
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিরব নজরুল লিখন নামে ভুক্তভোগী তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য রাজুর সাথে ২৩ হাজার ডলারে চুক্তিবদ্ধ হন। সে অনুযায়ী মাকে নিয়ে তুরস্কে যাওয়ার পর ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও কিডনি প্রতিস্থাপন না করেই দেশে পাঠিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী নিরব নজরুল লিখন তুরস্কে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ায় রাজধানীর শ্যামপুর থানায় একটি মামলা করেন। মূলত লিখনের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়েই যেন কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। পরে মামলার আসামি নুরুজ্জামান রাজুসহ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। গ্রেফতাররা হলেন- দিনাজপুরের নুরুজ্জামান রাজু (৩৬), মোহাম্মদ তরিকুল (৩০), সালমান ফারসি (৩৫), বরগুনার মাসুম বিল্লাহ (৪৩) এবং টাঙ্গাইলের ওয়ালিদ মিয়া (২৬)।
রাজু চক্রের প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী নজরুল বলেন, মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য ২৩ হাজার ডলারে চুক্তি করেছিলাম। চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিক একটা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিলাম। এরপর তুরস্কে যাওয়ার পর শুরু নানা ধরনের তালবাহানা। কিডনি রোগীর প্রতিটা সময় মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের ডায়ালাইসিস যেখানে অনিবার্য সেখানে সেটি পাচ্ছিলাম না, টালবাহানা করে আরো টাকা দাবি করছিল। সেখানে প্রায় ৪০ হাজার ডলারের একটি কাগজে সই নেয়া হয়, কয়েকধাপে প্রায় ৪৬ হাজার ডলার তার কাছ থেকে নেয়া হয় বলে অভিযোগ তার। পরে দেশে ফিরে টাকা ফেরত চাইলে মূলহোতা রাজু পাল্টা নানা ধরনের হুমকি দিতে থাকে। পরে বাধ্য হয়ে থানায় মামলা করি।
হাসান মাহমুদ নামে আরেক ভুক্তভোগী তার ভাইয়ের কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য তুরস্কে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার সাথেও ২৩ হাজার ডলারে চুক্তি করে আদায় করা হয়েছিল ৮০ হাজার ডলার। পরে আরো ১০ হাজার ডলার চেয়ে নানা ধরনের হুমকি দেয়া হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুরে র্যাব-৪ ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানি কমান্ডার কে এন রায় নিয়তি বলেন, চক্রটি বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য তুরস্কের প্রতিষ্ঠান ‘তার্কিশডকের’ ওয়েবসাইট অবিকল নকল করে ‘তার্কিশডক বিডি’ নামে ওয়েবসাইট খুলে। তারা কিডনি প্রতিস্থাপন, আইভিএফসহ রোগীদের তুরস্কে পাঠিয়ে সেখানে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে আসছিল।
চক্রের ফাঁদে তুরস্কে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েকজন দেশটির জেলে থাকার তথ্য পাওয়ার দাবিও করেছেন র্যাবের এ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছে এ রকম আরো কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। পরবর্তী তদন্তে বিষয়গুলো সামনে আসবে।
এর আগে গ্রেফতার রাজু আরেকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মেডিক্যাল প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে। সেই সুবাদে বিভিন্ন ধরনের রোগীর সাথে তার একটা যোগাযোগ ছিল। এ সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জটিল রোগে আক্রান্তদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে চিকিৎসা করানোর নামে প্রতারণা করে আসছিল।
প্রতারণা শুরুর পর গত তিন বছরে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে তিনি শতাধিক রোগীকে দেশটিতে পাঠিয়েছে। আমাদের সাথে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন যোগাযোগ করেছে। প্রতারণার অর্থ দিয়ে রাজু ঢাকা শহরে গাড়িবাড়ি করে ফেলছে।



