৫৬ বছরের অলিগার্কি স্থান বদল করেছে, ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়নি

নীতি গবেষণা কেন্দ্রের সভায় উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত

Printed Edition
সিরডাপ মিলনায়তনে নীতিগবেষণা কেন্দ্রের আলোচনা সভায় অতিথিরা :  নয়া দিগন্ত
সিরডাপ মিলনায়তনে নীতিগবেষণা কেন্দ্রের আলোচনা সভায় অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

নীতি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে দিনব্যাপী এক গোলটেবিল আলোচনায় নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অব: এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, গত ৫৬ বছরে দেশে যে অলিগার্কি গড়ে উঠেছে, তারা কেবল স্থান বদলেছে- ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়নি। ক্ষমতার ‘রুটিং হালুয়া’ না পেলে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ বিকৃত হয়ে যায়।

গতকাল রাজধানীর সিরড্যাপের এ টি এম শামসুল হক মিলনায়তনে আয়োজিত এ আলোচনার শিরোনাম ছিল- ‘বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী সংস্কার উদ্যোগ : প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে দিনব্যাপী এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণাধর্মী পুস্তিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পুস্তিকাটির শিরোনাম- ‘চব্বিশের রাষ্ট্র সংস্কার : কতটা স্বপ্ন, কতটা বাস্তব’।

নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হকের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনা সভার সূচনা হয়। নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি অধ্যাপক ড. তৌফিক এম. হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ড. শাকিল আহম্মেদ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ এখনো প্রকৃত সংস্কারের জন্য উপযুক্ত নয়। দেশ এখনো উপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যেই রয়ে গেছে। গত ৫৬ বছরে দেশে যে অলিগার্কি গড়ে উঠেছে, তারা কেবল স্থান বদলেছে- ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়নি। ক্ষমতার ‘রুটিং হালুয়া’ না পেলে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ বিকৃত হয়ে যায়। তবে যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, অন্তত সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, এটা একটি গণ-অভ্যুত্থান ছিল ক্ষমতা জনগণের হাতে গিয়েছিল। কিন্তু সেই ক্ষমতা আবার শেখ হাসিনার সংবিধানকে স্বীকৃতি দিয়ে তার হাতেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারকে সেনাসমর্থিত সরকার হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ৮ আগস্ট ২০২৪-এর সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে আরেকটি যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর সরকার গঠিত হয়েছে।

ফরহাদ মজহার সামনে একটি অন্ধকার সময়ের আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক সংস্কার না করে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা ও আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য আলাদা কমিশন না গড়লে এ সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হবে।

একাডেমিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী জানান, সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে হতাশ ছিলেন। তিনি জুলাইয়ের নতুন প্রজন্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারো একটি গণ-অভ্যুত্থান হতে পারে।

তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারই সবচেয়ে জরুরি। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে জামায়াতের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কিছু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দেখা যায়। জুলাইয়ে যদি একটি বিপ্লবী সরকার গঠিত হতো, তবে সংস্কার কার্যক্রম আরো কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারত।

সিরডাপ মিলনায়তনে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের আলোচনা সভায় অতিথিরা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বলেন, চলমান রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতির প্রতি তরুণদের গভীর হতাশা রয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় মূল লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচারী শাসনের পতন কেমন রাষ্ট্র গড়া হবে, সে বিষয়ে তখন পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। সংস্কারের জন্য বৈধ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন এবং বর্তমান সরকারের সে বৈধতা রয়েছে বলে মনে করি না। ফলে এ সরকারের পক্ষে সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না- সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

বাংলাদেশ জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনজুর আহমেদ বলেন, অতীতের মতো এবারের সংস্কার কমিশনগুলোও ব্যর্থ হবে কি না- সে আশঙ্কা রয়ে গেছে। কমিশনগুলোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো অন্তত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার তুষার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো একদিকে ঐকমত্য কমিশনের সাথে বসে সংস্কারের পক্ষে কথা বলছে, অন্য দিকে বাইরে এসে বলছে- এ সংস্কার তারা ছুড়ে ফেলবে। তাহলে এ জুলাই কিংবা জুলাই সনদের মূল্য কোথায়?

ড. শাকিল আহম্মেদ বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে চাইলে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করতে পারে। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই এ ধরনের উদ্যোগ হতে পারে। ব্রিটিশ আমল থেকে এ পর্যন্ত অসংখ্য কমিশন গঠিত হলেও অধিকাংশই শুরুতে আলোড়ন সৃষ্টি করে পরে কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে। ২৪-পরবর্তী সংস্কার কমিশনগুলোর পরিণতি যেন ৭১-পরবর্তী কমিশনগুলোর মতো না হয়।

আলোচনায় ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশন এবং ২০২৫ সালে গঠিত একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি নির্বাচিত কয়েকটি কমিশনের সুপারিশ ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা হয়।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাবেদ ইকবাল, এসআইপিজির (নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি) উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সালাউদ্দিন এম. আমিনুজ্জামান, নীতি গবেষণা কেন্দ্রের রিসার্চ ফেলো ড. খান শরীফুজ্জামান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও মতামত তুলে ধরেন।