বিশেষ সংবাদদাতা
জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রকাশ করেছে, যা দেশের তরুণদের দক্ষতা, উদ্যোক্তা সৃজন, আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স বৃদ্ধির লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গঠিত। কর্মসূচিটি মূলত দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণকে প্রাধান্য দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই পরিকল্পনা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সক্ষম।
তরুণদের জন্য পরিকল্পনা : কর্মসূচির একটি প্রধান অঙ্গ হলো তরুণদের ক্ষমতায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, যা দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টে বিশেষ মনোযোগ দেবে। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন করা হবে, যা শিক্ষিত তরুণদের প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং স্টার্টআপ গঠনে সহায়তা করবে।
প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে পাঁচ বছরের মধ্যে ৫০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। পরিকল্পনায় নারী, যুবক এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে পাঁচ লাখ নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার গঠনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য বিশেষ স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণদের জন্য এমন ব্যাপক পরিকল্পনা শুধু কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে না, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উদ্ভাবনমুখী পরিবেশও গড়ে তুলবে। তবে বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দক্ষতা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয় অপরিহার্য।
আইসিটি খাত ও ভিশন ২০৪০ : কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো আইসিটি ও ডিজিটাল অর্থনীতি। জামায়াত ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি ও প্লেসমেন্ট করা। ফ্রিল্যান্সার এবং ডিজিটাল রফতানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন করা হবে।
আইসিটি খাত থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রফতানি আয় এবং সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচিতে শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইসিটি খাতের সম্প্রসারণ ডিজিটাল রফতানি, ফ্রিল্যান্সিং ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ অপরিহার্য।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ : জামায়াতের কর্মসূচিতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিকেও অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তা ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশী পেশাজীবী, গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এতে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বৃদ্ধি হবে না, বরং দেশের শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তি খাতেও নতুন উদ্ভাবন আসবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং অভিজ্ঞ প্রবাসী জনশক্তি দেশে ফিরিয়ে আনা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হবে। তবে প্রবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা ও প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত বিশ্লেষণ : জামায়াতের এই অর্থনৈতিক কর্মসূচি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েছে- তরুণ ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরি; আইসিটি খাত সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল অর্থনীতি; রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি, প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী ভিত্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ নিশ্চিত হবে। তবে সরকারের সহমত, বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ প্রশাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয় ছাড়া এটি পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কর্মসূচি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা হলে এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যুবসমাজের ক্ষমতায়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়াতে পারে।



