পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের ওপর হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

সীমান্তে বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা, ফের পুশইনের শঙ্কা

এস এম মিন্টু
Printed Edition

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভের পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সেই সাথে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাকর্মীদের ওপর বিজেপি নেতাকর্মীদের মারধর ও দোকান-পাট, দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে। তারা বলছেন বিজেপি ক্ষমতায় আসতে না আসতেই মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়ে গেছে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বিজেপির নেতাকর্মীরা বলছেন, অনেক এলাকায় তাদের নেতাকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। রাজ্যে বিভিন্ন জায়গায় দোকানপাট বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুসলিমদের বাড়ি-ঘর, দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী একাধিক স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘অনুপ্রবেশ বা পুশইন’ আশঙ্কায় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার এবারের নির্বাচনে বিজেপি ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণাকে বেশ কাজে লাগিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিমবিরোধী প্রচারও ছিল অনেক। গত সোমবার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবিতে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। পরাজয়ের পর মমতা ব্যানার্জীকে উদ্দেশ্য করে রাজ্যের বিভিন্নস্থানে নেতাকর্মীদের মারধর, বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোাগের ঘটনা ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কারণে এর প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্তেও পড়তে শুরু করেছে। এমন আশঙ্কায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেশের সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অপর দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলে পুশইনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ।

এ দিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলের পর মমতা ব্যানার্জী পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছেন। কারণ তিনি এই হারকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন। মমতার এমন ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সেই সাথে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল রূপ নিতে পারে ধর্মীয় সহিংসতায়। কারণ বিজেপির নেতারা বলছেন হিন্দুত্বতাবাদীদের ভোটেই তারা নির্বাচিত হয়েছেন। মুসলিমরা ভোট দিয়েছে মমতা ব্যানার্জীকে।

এ দিকে নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক নেতাকর্মী এই ফলাফলে বিস্মিত এবং তারা মনে করছেন যে এই পরাজয় অস্বাভাবিক। ইতিমধ্যে বিজেপি এই বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে সুশাসনের জয় বলে অভিহিত করেছে। এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে কারণ, পশ্চিমবঙ্গে অভ্যন্তরীণ সঙ্কট তৈরি হতে পারে। আর স্থানীয়ভাবেও বাংলাদেশবিরোধী কিছু তৎপরতা দেখা দিতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশ সীমান্তে ও বাংলাদেশে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক প্রচারণা ভিন্ন জিনিস। কিন্তু সরকারকে মাঝপথ দিয়ে চলতে হয়, মধ্যপন্থী হতে হয়। সেখানে উগ্রতার জায়গা খুব বেশি নেই। কারণ উগ্র হতে গেলেই নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হবে।

তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক একটা অ্যাডজাস্টমেন্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি, রাজ্য সরকারেও বিজেপি। আর কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে রাজ্য সরকারের খুব বেশি কিছু করার নেই। তাই আমি সতর্কভাবে আশাবাদী হতে চাই যে, ভারত সরকার গত দুই বছরে বুঝেছে যে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আগের মতো থাকবে না। বাংলাদেশ সমতার ভিত্তিতে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক চায়। আমরা সেই ভিত্তিতেই এগিয়ে যেতে চাই। তবে যদি পুশইন করা, সীমান্তে গোলমাল করা বা কোনো কারণে যদি বাংলাদেশ বুঝতে পারে যে তারা পশ্চিমবঙ্গকে ব্যবহার করছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, তাহলে তো সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না।

ফলাফলের পর যেসব স্থানে হামলা : ভোটের ফল প্রকাশের পরে উত্তপ্ত হয়ে উঠে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি। পেটকুলচাঁদ এলাকায় বিজেপি কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বুধবার রাতে বাইকে ফেরার সময় পথ আটকে লাঠি এবং রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়।

বীরভূমের নানুরে ভোট-পরবর্তী ‘সহিংসতা’র বলি হন একজন। নানুরে এক তৃণমূলকর্মীকে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। মৃতের নাম আবির শেখ। পরিবারের অভিযোগ, আবিরকে রাস্তায় একা পেয়ে বিজেপিকর্মীরা ঘিরে ধরে তাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। অপর দিকে গতকাল বারুইপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত চম্পাহাটির পঞ্চায়েত অফিসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়াও বারুইপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের ফুলতলা দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে।

অপর দিকে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের ওয়ার্ডেই তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ উঠে। গৌতমের ৩৩ ওয়ার্ডে তার দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ উঠে।